প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মালয়েশিয়ায় প্রায় ৫২ বছর ধরে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত আছে। ১৯৭৪ সাল থেকে মালয়েশিয়া মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসরায়েলের সঙ্গে কোন ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ইসরায়েলি নাগরিকদের দেশের ভেতর প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয়েছে। আটজন মার্কিন আইনপ্রণেতা মালয়েশিয়াকে একটি হুমকি দিয়ে বলেছে, যদি কুয়ালালামপুর ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক প্রশিক্ষণ তহবিল স্থগিত করবে।
কিন্তু এই মার্কিন হুমকির প্রতি মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, ‘‘মালয়েশিয়া প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তার সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগ করছে’’। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ইসরায়েলি নাগরিকদের মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। একইসাথে, যারা মালয়েশিয়ায় বসবাসরত ইসরায়েলি নাগরিক তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে খুঁজে বের করা হবে। খবর দ্য সাউথ চায়না পোস্টের।
মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মতে, মালয়েশিয়ার সরকার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে তাদের নির্বাসিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বুধবার (২২ জুলাই) সেরেম্বানে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, ‘‘এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’’। তিনি বলেন, ‘‘আমরা এখানে যেকোনও ইসরায়েলি নাগরিকের উপস্থিতির বিরুদ্ধে; ইহুদিদের বিরুদ্ধে নয়’’। কারণ তিনি দাবি করেন, ‘‘ইসরায়েলি নাগরিকরা ফিলিস্তিন ও গাজায় হত্যা, অপরাধ এবং নিপীড়ন ও উপনিবেশায়নে জড়িত’’।
এর আগে, মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে একটি চিঠি পাঠান ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্যরা, যেখানে বলা হয় যে আনোয়ার ইব্রাহিম শুধুমাত্র জাতীয়তার কারণে আমেরিকার এক ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের নাগরিকদের ‘খুঁজে বের করে বহিষ্কার’ করার অঙ্গীকার করেছেন। এই আইনপ্রণেতারা রুবিওকে জানান, আন্তর্জাতিক সামরিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির (International Military Education and Training programme) মাধ্যমে মালয়েশিয়া মার্কিন প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশাধিকার ও নিরাপত্তা সহায়তা লাভ করেছে।
চিঠিতে তারা মালয়েশিয়ার সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পর্যালোচনা করার আহ্বান জানান। এছাড়া কুয়ালালামপুরকে ১৫ দিনের মধ্যে তার নীতি পরিবর্তন না হলে ওই কর্মসূচির অর্থায়ন স্থগিত করারও অনুরোধ জানান। চিঠিতে বলা হয়, ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে মালয়েশিয়ার অস্বীকৃতি উদ্বেগজনক।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা আনোয়ার ইব্রাহিমের সরকারকে হামাসের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। তারা বলেন, ‘‘হামাস হলো একটি ফিলিস্তিনি জঙ্গি গোষ্ঠী’’। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে তারা জানান, হামাসের যোদ্ধারা মালয়েশিয়ার মাটিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। আনোয়ার ইব্রাহিম এই অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলেন। তিনি বলেন, ‘‘মার্কিন আইনপ্রণেতারা হুমকি দিতে পারে, কিন্তু আমি মালয়েশিয়ার জনগণের অধিকার কঠোরভাবে রক্ষা করব’’।
এছাড়া তিনি আরও বলেন, ‘‘মালয়েশিয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। আমরা আমাদের অধিকার প্রয়োগ করি’’। তিনি বলেন, ‘‘আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি যে মালয়েশীয়রা নারী-পুরুষের মর্যাদাকে সম্মান করে’’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফরেস্ট সিটির প্রযুক্তি ও ডিজিটাল নোম্যাড কমিউনিটি 'নেটওয়ার্ক স্কুল'কে কেন্দ্র করে একটি তদন্তের সূত্রে বিতর্কের সূচনা হয়। অনলাইনে অভিযোগ ওঠে যে, ইসরায়েলিরা দ্বিতীয় দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে সেখানে বসবাস করছে। আনোয়ার ইব্রাহিম তখন বলেন, যদি ওই প্রযুক্তি কমিউনিটিতে কোনও ইসরায়েলি নাগরিক পাওয়া যায় তাকে অবিলম্বে বহিষ্কার করা হবে।
পরে মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্মকর্তারা ৪০টি দেশের ২৬৬ জন বিদেশিকে তদন্ত করে প্রথমে দেখে যে, সকলের কাছে বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। তবে, তদন্ত অব্যাহত রয়েছে ১১ জনের ক্ষেত্রে, যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। জোহর কর্তৃপক্ষ নেটওয়ার্ক স্কুলের লাইসেন্স বাতিল করে এবং কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। তারা জানায়, এই পদক্ষেপটি আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাধারণত ইসরায়েলি পাসপোর্টধারীদের প্রবেশের জন্য বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দ্বিতীয় দেশের পাসপোর্ট নিয়ে প্রয়োগ প্রক্রিয়া জটিল। এই সাম্প্রতিক বিতর্কটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে উত্তেজনাকে পুনরজ্জীবিত করেছে, যখন আনোয়ার ইব্রাহিম সংসদে বলেন হমাসকে নিন্দার বিষয়ে অস্বীকৃতির কারণে মালয়েশিয়া তিনটি মার্কিন কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র পেয়েছে। ১৩ ও ৩০ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবাদপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল এবং মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে ওয়াশিংটনে তলব করা হয়েছিল।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, এই বিতর্ক কুয়ালালামপুরের বৃহত্তর সম্পর্ককে ক্ষতি করবে না। তিনি বলেন, ‘‘ফিলিস্তিন ও গাজায় নিরীহ মানুষ হত্যার নিন্দা জানাতে ভীত হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়’’।
এদিকে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের মতে, ২০২৫ সালে মালয়েশিয়ার সঙ্গে মার্কিন পণ্য বাণিজ্য ৮৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে, যেখানে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি ১৩.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। টেলর’স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র লেকচারার জুলিয়া রকনিফার্ড বলেন, শুধুমাত্র এই বিরোধ বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কে ফাটল ধরানোর সম্ভাবনা কম। কারণ, এই সম্পর্কগুলো বৃহত্তর কৌশলগত বিবেচনার দ্বারা গঠিত হয়। তবে, রোকনিফার্ড ক্ষতিটা বলছেন, এই বিরোধ ফিলিস্তিন ও গাজাসহ আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের চেষ্টায় অংশগ্রহণের জন্য মালয়েশিয়ার আমন্ত্রণ পাওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন