প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গত দুই মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে আলুর দামে ধস নেমেছে, যা চলতি মৌসুমে প্রভাব ফেলেছে। বাজারে আলুর দাম কমে যাওয়ার ফলে বিএডিসির ‘বীজ আলু’ তুলতে ডিলারদের আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে এই ভরা মৌসুমে।
বীজ আলু সংগ্রহের জন্য বিএডিসির কর্মকর্তারা ইনসেনটিভ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গত ১৫ দিনে, পাঁচ জেলার ৭৪ জন ডিলার মাত্র ৩৬৬ মেট্রিক টন বীজ আলু সংগ্রহ করেছেন।
হিমাগারগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ আলু থাকার কারণে, কৃষকের লোকসান এবং হিমাগারে থাকা আলুর দাম কম হওয়ায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে বিএডিসি জানিয়েছে।
সূত্র জানাচ্ছে, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় বিএডিসির অনুমোদিত ৮১৩ জন ডিলার রয়েছেন। চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে বীজ আলু বিক্রি শুরু হয়েছে।
চার হাজার ৪৭৪ মেট্রিক টন বীজ আলু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে, গত ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৭৪ জন ডিলারের কাছে মাত্র ৩৬৬ মেট্রিক টন বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে রংপুরে ২২৬ মেট্রিক টন, কুড়িগ্রামে ২০ মেট্রিক টন, নীলফামারী জেলায় ৩৮, লালমনিরহাট জেলায় ৪৫ এবং গাইবান্ধা জেলায় ৪০ মেট্রিক টন বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮ শতাংশের কিছু বেশি বীজ বিক্রি হয়েছে।
ডিলারদের মধ্যে অনেকেই এখনও বীজ আলু তুলতে পারেননি। যেসব জেলায় বীজ বিক্রি হয়েছে, তার মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলায় সবচেয়ে কম বিক্রি হয়েছে।
কৃষক ও ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদিত আলুর ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে কৃষক গত দুই মৌসুমে লোকসানে পড়েছেন। বর্তমানে হিমাগারে থাকা খাবার আলুর দাম কেজিপ্রতি ১২ টাকায় নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন মৌসুমে আলুর চাষ কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে কৃষকরা শঙ্কিত। বাজারে চাহিদা না থাকায়, সরকারি বীজ আলু তুলতে ডিলাররা অনীহা প্রকাশ করছেন।
রংপুর অঞ্চলের ১২টি হিমাগার থেকে বিএডিসির বীজ আলু ডিলারদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য প্রতি কেজি (গ্রেট-১) ২৭ টাকা। কিন্তু বাজারে খাবার আলুর দাম এর প্রায় অর্ধেক। ফলে ২৭ টাকা কেজি দরে বীজ তুলে বাজারজাত করে লাভের সম্ভাবনা দেখছেন না ডিলাররা।
লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ কাকিনা বাজার এলাকার ডিলার মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি গতবছর পাঁচ টন তুলেছি। এবারও পাঁচ টন তুলব। গত বছর লোকসান হয়েছে। এবারও লোকসান হবে। মূলত, লাইসেন্স রক্ষায় লোকসান মেনে বীজ আলু তুলতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বাজারে আলুর দাম নেই। গত মৌসুমে কৃষক লোকসানে পড়েছেন। নতুন করে বীজ কিনে চাষ করতে কৃষকের আগ্রহ কম। তাই চাহিদা না থাকলে বীজ তুলে পুঁজি আটকে রেখে লাভ কী।’
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ডিলার সিরাজুল ইসলাম মন্তব্য করেন, যে পরিমাণ আলু উৎপাদিত হয়, তা দেশের চাহিদা পূরণ করে তুলনামূলক গুণগত মান রক্ষা করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে কৃষি, কৃষক ও ডিলার- সবাই উপকৃত হতো। কিন্তু আলু নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। লোকসান হলেও বীজ তুলতে হচ্ছে। কৃষক লাভের আশায় আলু চাষ করলেও শেষে লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ২০২৪-২৫ মৌসুমে এক লাখ ১৯ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। ২০২৫–২৬ মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় এক লাখ পাঁচ হাজার ৮৮৫ হেক্টরে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আবাদ কমেছে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর। চলতি অর্থ বছরে খসড়া হিসাব এক লাখ পাঁচ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে।
কৃষি বিভাগ এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন অর্থ মৌসুমে আবাদ কমলেও উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে সরবরাহের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
রংপুর বিভাগের আট জেলায় ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রায় ৫১ লাখ ৭৮ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। অথচ উৎপাদিত আলুর মাত্র প্রায় ২৩ শতাংশ হিমাগারে সংরক্ষণের সুযোগ পেয়েছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে হিমাগারে থাকা আলুর প্রায় ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ বিক্রি হয়নি। ফলে মাঠে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে।
রংপুরের পীরগাছার দেউতি এলাকার কৃষক মোজাম্মেল হক জানান, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে তিনি বড় লোকসানে পড়েছেন। ৩৩ শতকের এক বিঘা জমিতে বীজ, সার, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, সেচ, আলু তোলা ও জমি লিজসহ মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৫১ হাজার ৪০০ টাকা। ফলন হয়েছিল প্রায় এক হাজার ৯৮০ কেজি। কেজিপ্রতি ১৫ টাকা দরে বিক্রি করে আয় হয় ২৯ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ এক বিঘায় লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ২১ হাজার ৭০০ টাকা।
একই চিত্র ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের মৌসুমের শুরুতেও দেখা যাচ্ছে। রংপুরের বিভিন্ন বাজারে নতুন আলু ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, যেখানে উৎপাদন খরচ ছিল প্রায় ১৪ টাকা। ফলে কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা লোকসান গুণতে হয়েছে কৃষককে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবছর আলুর উৎপাদন বাড়লেও বাজার ব্যবস্থাপনায় সে অনুযায়ী পরিকল্পনা নেই। দেশে কত আলুর প্রয়োজন, কত উৎপাদন হবে, কতটা হিমাগারে রাখা যাবে এবং উদ্বৃত্ত আলু কোথায় যাবে- এসব বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা না থাকায় উৎপাদন বেশি হলেই বাজারে ধস নামে।
ডিলারদেরও প্রায় একই দাবি। কুড়িগ্রামের আবুল কালাম আজাদ নামে এক ডিলার বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর না দিয়ে আলুর বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে মানসম্মত আলু বিদেশে রপ্তানি, প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্প্রসারণ এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, লোকসান হলেও আলু বীজ তুলতে হবে। কারণ, লাইসেন্স নাবায়ন হবে না। কিছুদিন পর পরিস্থিতি অনুযায়ী বীজ সংগ্রহ করবো।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি। আলু উদ্বৃত্ত হচ্ছে, মানুষ অনেকেই খাচ্ছে না। সে কারণে দামও কম। এ কারণে কৃষককে লোকসানে পড়তে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বলছি, শুধু আলু নয়- ভুট্রাসহ অন্যান্য ফসলের চাষও করতে। আলুর পাশাপাশি কৃষক লাভজনক হবে- এমন ফসলের দিকে আগ্রহী করে তুলতে চেষ্টা করছি তাদের।
বিএডিসি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান বলেন, ‘ডিলাররা মূলত কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী বীজ সংগ্রহ করেন, আগাম বুকিং নেন, কিন্তু গত দুই বছর পর পর লোকসানের কারণে কৃষক এবার এখনও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এখনও হিমাগারে প্রচুর আলু রয়েছে। দিনে দিনে দামও কমছে। সেটাই একটি সমস্যা।’
উপপরিচালক আরো বলেন, ‘আমরা ইনসেনটিভ ঘোষণা করেছি, প্রচারণা চালাচ্ছি। ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। আশা করছি আমাদের লক্ষ্য পূরণ হবে। কারণ এখনও সময় আছে ডিসেম্বর পর্যন্ত।’
কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, গত মৌসুমের আলুর লোকসানের ক্ষত কৃষকদের এখনও শুকায়নি। তার মধ্যেই নতুন মৌসুমের বীজ বাজারে এসেছে। খাবার আলুর দাম যেখানে ১২ টাকার আশপাশে, সেখানে সরকারি বীজের দাম ২৭ টাকা। এই ব্যবধানই কৃষক ও ডিলারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
কৃষক নেতা বলেন, কৃষক, ডিলার ও কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে উৎপাদন পরিকল্পনা, সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং কার্যকর কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে আলুর উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের লোকসানের চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এসব দাবি নিয়ে কাজ করছি। কিন্তু কোনো ফল বের হচ্ছে না। ফলে কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা লোকসানে পড়ছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন