প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
থানার কলাপসিবল গেটের অপরপ্রান্ত থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রাকিবুল ইসলাম কথা বলছেন। তার পাশেই উপস্থিত হয়েছেন কোতোয়ালি থানার ওসি আজাদ রহমান ও পুলিশের অন্যান্য সদস্যরা।
রংপুর মহানগরীতে থানার ভেতরে এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার অভিযোগ উঠেছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। এই ঘটনার সময় বুধবার (৩ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে কোতোয়ালি থানার ভেতর এ ঘটনা সংঘটিত হয়।
পরে এই ঘটনার পর তিন পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মারধরের শিকার ওই নেতার নাম রাকিবুল ইসলাম রাকিব। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের রংপুর সদর উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব।
রাকিবুল ইসলাম রাকিব দাবি করেছেন, থানার ভেতরে ওসি আজাদ রহমানের নেতৃত্বে বেশ কিছু পুলিশ সদস্য তাকে মারধর করেন।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে নগরীর সিও বাজার এলাকার একটি প্রেমিক যুগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়েছিল। ওই যুগলকে উদ্ধার করার পর বুধবার সন্ধ্যায় কোতোয়ালি থানায় আনা হয়। ওই যুগলের পরিবারের অনুরোধে বিষয়টি মীমাংসার জন্য স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু নেতা থানায় যান। লাভলু নামে এক নেতার ডাকে রাকিবুল ইসলাম রাকিব থানায় গিয়েছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, থানায় গিয়ে রাকিবুল ইসলাম রাকিব দেখতে পান, এক পুলিশ সদস্য ওই যুগলকে মারধর করছেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানালে ওসি ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে মারধর করেন। এ ঘটনায় তিনি রক্তাক্ত ও আহত হন।
ঘটনার খবর পেয়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা থানার সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে থানার কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ সময় গেটের ভেতর থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাকিবুল ইসলাম। তখন তার শরীরে রক্তের দাগ ও আঘাতে একটি চোখ ফুলে যেতে দেখা যায়।
রাকিবুল ইসলাম অভিযোগ করেন, উদ্ধৃত প্রেমিক যুগলকে থানার ভেতরে এক পুলিশ সদস্য মারধর করছিলেন। বিষয়টি দলের এক নেতাকে জানাতে যখন তিনি পকেট থেকে ফোন বের করেন, তখন ওসি, এসআই ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য তার ওপর চড়াও হন। পরে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়।
এসময় কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, এখানে ওসি, এসআই আমাকে রাইফেল দিয়ে মারল। বারবার তাদের অনুরোধ করেছি, পরিচয় দিয়েছি যে আমি স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব, বিএনপির একজন কর্মী। আমাকে ১৩টা মামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও তারা আমাকে মারধর করেছে, যার ফলে আমার চোখ সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্দুক দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করছে। আমার ফোন দুটো ছিনতাই করেছে। পুলিশের চরিত্র অনেকটা ফ্যাসিবাদী। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মারধরের পর পুলিশ সদস্যরা তাকে জোর করে নিয়ে গিয়ে শরীরে লেগে থাকা রক্ত ধুয়ে দেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের সামনে রক্তমাখা তুলা দেখান এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন প্রদর্শন করেন।
ঘটনার খবর পাওয়ার পর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু থানায় যান। পরে মারধরের শিকার ওই নেতাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পরে রাত ১১টার দিকে থানার ধারে ওই যুগলকে মুক্তি দেওয়া হয়। এ সময় থানার ভেতরে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সদর উপজেলার হরিদেবপুর ইউনিয়নের বিএনপির নেতা জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, রাকিবকে পুলিশ ধরে মারল, আমি মাথায় ঘুসি লেগেছিল। ওই যুগলকে ধরে মারছে, এটা নিষেধ করার কারণে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওসি নিজেই স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা রাকিবকে পিটিয়েছে। এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলতে উপস্থিত নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেন সামসুজ্জামান সামু। বিএনপির নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেষ্টা করেন।
এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন রংপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব জাকারিয়া ইসলাম জিম। তিনি বলেন, পোশাক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু পুলিশের চরিত্র পরিবর্তন হয়নি। তাদের রক্তে এখনো আওয়ামী স্বৈরাচারীর গন্ধ পাওয়া যায়। আমরা জানি পুলিশ মানবিক, কিন্তু পুলিশের এই আচরণ আমরা আশা করিনি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আমরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবো। প্রয়োজনে থানার ঘেরাও করা হবে।
অন্যদিকে, মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে কোতোয়ালি থানার ওসি আজাদ রহমান বলেন, উদ্ধার হওয়া প্রেমিক যুগলের দুই পরিবারের মধ্যে হাতাহাতি হলে তারা থামান।
তবে আহত স্বেচ্ছাসেবক দলনেতার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও কাপড়ে রক্তের দাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক সময় আম গাছের আঘাতেও রক্ত বের হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল مাবুদ বলেন, এরকম অভিযোগ পেলে অবশ্যই বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ২টার পর রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়, এ ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে পুলিশ লাইন্সে রিপোর্ট (ক্লোজড) করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা নারী কনস্টেবল লিমা সরেন, ডিউটি অফিসার মেহেরুন্নেসা ও সাব-ইন্সপেক্টর মাসুদ রানা।
একইসঙ্গে এ ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমাকে সভাপতি, ডিসি (ক্রাইম) মো. মাহফুজুর রহমান এবং এসি কোতোয়ালী সুকুমার রায়কে সদস্য করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ জন্য সবার কাছে ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন