প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার খাল-বিল ও জলাশয়ের দূষিত পানি ব্যবহার করে বরফ তৈরি হচ্ছে। ফ্রি-স্টাইলে যুগের পর যুগ দূষিত পানির মাধ্যমে প্রস্তুত বরফ দিয়ে সমুদ্র অথবা নদী থেকে আহরিত ইলিশ এবং নানা ধরনের সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণ করে বাজারজাত করানো হচ্ছে। এসব দূষিত বরফ ব্যবহার করে মাছ খাওয়ার ফলে মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি মরনব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ওই দূষিত পানির বরফে সংরক্ষণ করা মাছের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে জেলেরা মাছের ন্যায্য দামও পাচ্ছে না। কলাপাড়া এলাকায় ৬০টিরও অধিক বরফকল রয়েছে, কিন্তু সেখানেও মাত্র একটি বরফকল নিরাপদ পানির ব্যবহারে বরফ উৎপাদন করে। বর্তমানে কলাপাড়ার উপকূলে ডিপ অথবা শ্যালো স্থাপন করেও সুপেয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এই কারণে ফ্রি-স্টাইলে দূষিত পানির তৈরি বরফ ব্যবহার করে প্রতি বছর অন্তত ৫০ হাজার মেট্রিকটন ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। যা মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত নয় এবং নিরাপদ নয়।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মানবস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে এবং মৎস্য সম্পদের গুণগত মান বজায় রাখতে বরফ তৈরির জন্য ব্যবহৃত পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মূলত: নিরাপদ পানির ব্যবহার, পানির লাইন পৃথকীকরণ, নিয়মিত ল্যাব টেস্ট এবং পানির ট্যাংক ও কাঠামোর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কলাপাড়া উপজেলার মুন, লাবীবা, ভাই ভাই, জমজম এবং তামান্না আইস প্লান্টের বরফকলের পানির মান যাচাইয়ের জন্য অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদেক অভিযানের নেতৃত্ব দেন।
তিনি জানান, বরফকলগুলোর বরফ উৎপাদনে ব্যবহৃত পানির উৎস এবং আশপাশের পরিচ্ছন্নতার জন্য অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হচ্ছে। কুয়াকাটা সি ফুড আইস প্লান্টে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যায়ে ফিল্টার পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে। যেহেতু এটি ব্যয়বহুল, তাই প্রত্যেক বরফকলে এই ধরনের ফিল্টার উন্মুক্ত করা সম্ভব নয়। এর জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কুয়াকাটায় দেড় একর জমিতে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, মাছ অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং দ্রুত পচনশীল খাদ্য। মাছ ধরার পর থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত এর সতেজতা বজায় রাখতে বরফ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। কিন্তু যদি মাছ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত বরফ অনিরাপদ বা দূষিত পানির মাধ্যমে তৈরি হয়, তাহলে সেই বরফ মাছকে নিরাপদ রাখার পরিবর্তে জীবাণু ও রাসায়নিক দূষণের উৎসে পরিণত হতে পারে। এর ফলে মাছের গুণগত মান দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, খাদ্যজনিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয়, কৃষিজ রাসায়নিক, কীটনাশক, আগাছানাশক এবং সারজাতীয় রাসায়নিক প্রয়োগ করা পানির উৎস থেকে সংগৃহীত পানি দিয়ে বরফ তৈরি হলে, সেই মাছ খেয়ে যেকোনো বিষক্রিয়া ও হরমোনজনিত সমস্যাগুলি আসতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী ক্যান্সারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
দূষিত পানির তৈরি বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ করলে, মাছের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং দ্রুত পচনশীল হয়ে পড়ে। কারণ দূষিত বরফে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেশি থাকে। ফলে মাছ কোমল হয়ে যায়, দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং বাজারমূল্য কমতে থাকে। জীবাণুর কার্যকলাপের কারণে মাছের প্রোটিন নষ্ট হয়ে যায়। দূষিত বরফ ব্যবহারে জেলেদের ক্ষতি হয়, মাছ দ্রুত নষ্ট হয়, বাজারমূল্য কমে যায়, ব্যবসায়ীদের ক্ষতি, ভোক্তাদের আস্থা কমে যায়, জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি ঘটে এবং রপ্তানিযোগ্য মাছের মানহীন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম ক্ষুণ্ন হয়, যার ফলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
কলাপাড়া উপজেলার প্রাক্তন স্বাস্থ্য প্রশাসক ডাঃ আব্দুর রহিম জানান, দূষিত পানির বরফে জীবাণু, ভাইরাস বা রাসায়নিক দূষক থাকতে পারে। বরফ গলে গেলে মাছের ত্বকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। খাদ্যবাহিত রোগ যেমন সালমোনেলোসিস, শিগেলোসিস, কলেরা, হেপাটাইটিস এ এবং নোরোভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ভারী ধাতু যেমন সিসা, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। যদি দূষিত পানির বরফে কলেরা, টাইফয়েড বা হেপাটাইটিস এ-এর জীবাণু বা ভাইরাস উপস্থিত থাকে, তাহলে মাছ দূষিত হতে পারে, এবং যথাযথভাবে রান্না না করা বা দূষিত অবস্থায় খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া, দূষিত বরফে পরজীবীর ডিম বা সিস্ট থাকলে পরজীবী সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে। অন্যদিকে রাসায়নিক দূষক মাছের শরীরে জমে বিষক্রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। ভারী ধাতু মাছের শরীরে স্থানান্তরিত অথবা জমা হতে পারে, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে বিষক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যসমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘মাছের গায়ে যদি ক্ষত বা কাটা অংশ থাকে তবে জীবাণু দ্রুত প্রবেশ করতে পারে। তবে সাধারণভাবে দূষণ সবচেয়ে বেশি হয় মাছের বাইরের অংশে। তবে মূল বার্তা হচ্ছে, দূষিত বরফ মাছের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যবহার করা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, ‘অনিরাপদ বা দূষিত পানির তৈরি বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ করলে মাছ রোগজীবাণু, রাসায়নিক দূষক এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ দ্বারা দূষিত হতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে মাছের স্বাদ, গন্ধ, রং, পুষ্টিমান ও সংরক্ষণক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দূষিত বা অনিরাপদ বরফ ব্যবহারে ফলস্বরূপ আহরিত মৎস্যের আহরণ পরবর্তী ক্ষতি হয়, যার পরিমাণ প্রায় ৮%। তাছাড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ইতিমধ্যে নিরাপদ ও পানযোগ্য পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় মৎস্য অধিদপ্তর কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মাছের গুণগত মান বজায় রাখতে নিরাপদ পানির তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত বরফ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন