প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত নতুন করে একটি পুরনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কোনো ধরনের সমঝোতা কি সত্যিই ইরানের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে, নাকি এটি কেবল আরও বড় সংঘাতের আগে সাময়িক বিরতি? যেখানে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার কথা প্রতি মুহূর্তে বদল করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বদল করেন বিশেষ করে ইরানে হামলার পর থেকে পশ্চিমা মিডিয়া তথা তার নিজ দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়ায় তার এই কোন কথা স্থির না থাকার বিষয়টি সংখ্যা ধরে হিসেব করে তুলে ধরেছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে এবং বিশ্বের একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্র ইসরাইলকে পাশ কাটিয়ে ইরানের সাথে চুক্তিকে কি ইরান সত্যিই চুক্তি বলে মনে করছে?
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল কর্তৃক ইরানে ভয়াবহ হামলার মাধ্যমে যুদ্ধের শুরু থেকে যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—যে, ইরান দীর্ঘ কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো সুপার পাওয়ার তথা পশ্চিমা পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের বিরুদ্ধে এমন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, যা বিশ্বের কোন রাষ্ট্র আজ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরাইলের বিরুদ্ধে দেখাতে পারেনি। যা শুধু ইসরাইল নয়, যুক্তরাষ্ট্রকেও নতুন বাস্তবতা বিবেচনা করতে বাধ্য করে।
দীর্ঘ সংঘাত, বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির চাপ, এর ফলে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব, আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং সামরিক ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতি এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রমাগত ফুরিয়ে যাওয়া —সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের জন্য বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ভয়াবহ ছিল অথবা পরিস্থিতি ততটা সহজ ছিল না।
এই বাস্তবতায় ইসরাইলকে সামনে রেখে পরম মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক যে কৌশল দীর্ঘদিন অনুসরণ করা হয়েছে, তা সাময়িকভাবে পরিবর্তিত হয়ে আলোচনার পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ডিজিটাল আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি ও পরবর্তী চুক্তির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটিকে অনেকেই কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখলেও এখানে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন ভিন্ন।
ইরান কি ইতিহাস থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নিয়েছে?
যে পশ্চিমা শক্তি তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে ইরানের আঞ্চলিক শক্তিকে সীমিত রাখার দিকে, তাদের ঐতিহাসিক বিপ্লবী সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনের দিকে, তাদের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্যে কার্যকর, সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি কতটা স্থায়ী হতে পারে কিংবা ইরান কোন বিশ্বাসে এই চুক্তি করতে পারে? ইতিহাস কি বলে যে, প্রতিটি চুক্তি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে? নাকি বহু ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রয়োজন শেষ হলে চুক্তিও গুরুত্ব হারিয়েছে? আশঙ্কা এখানেই।
যদি এই যুদ্ধবিরতি কেবল সময় সংগ্রহের কৌশল হয়ে থাকে, তবে সেই সময় কে কীভাবে ব্যবহার করবে? ইরান কি নিজেদের প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি আরও বাড়াবে? ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য কে বেশি লাভবান হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজই হয়তো পাওয়া যাবে না। কিন্তু যুদ্ধবিরতির অল্প সময়ের মধ্যেই হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা ও হামলার ঘটনাকে অন্তত সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা মনে হয় অস্বাভাবিক কিছু নয়। যদি ভার্সাই চুক্তি বৃহত্তর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের কৌশলের অংশ হয়ে থাকে, তবে ইরানের নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন করে পরিস্থিতি মূল্যায়নের সময় এসেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে যে শক্তি ইরান প্রদর্শন করেছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। যে পরাশক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা একসময় অকল্পনীয় মনে করা হতো, সেই শক্তিকেই দীর্ঘ সংঘাতের পর আলোচনার টেবিলে বসতে হয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আলোচনার টেবিলে বসা আর স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কি একই বিষয়? এটি বিশ্বাস করা অত্যন্ত কঠিন একটি বিষয়।
কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই; আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ। আর সেই স্বার্থের কাছে চুক্তি, প্রতিশ্রুতি কিংবা কূটনৈতিক ভাষা অনেক সময়ই গৌণ হয়ে যায়।
তাই ইরানের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যুদ্ধ জয় নয়; বরং প্রতিপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল সঠিকভাবে বোঝা। যদি এই চুক্তিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, তবে সেটি হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের সিংহ খ্যাত ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল। আর যদি এটিকে সাময়িক বিরতি ধরে ভবিষ্যতের জন্য সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়, তবে ইতিহাস হয়তো ভিন্নভাবে লেখা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখনো শেষ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। বরং যুদ্ধবিরতির আড়ালে নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি চলছে কি না, সেটিই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ইরানের উচিত অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমানের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি—সবকিছুকে নতুন করে মূল্যায়ন করা। তা না হলে পারস্য তথা ইরানি জাতি যে কারো কাছে কখনোই মাথা নত করে না- এই কথার যে বাস্তবতা কিংবা হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখার যে সাফল্য সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া যুদ্ধে দেখিয়েছে তা ভবিষ্যতে ধাক্কা খেতে পারে এমন আশঙ্কা করা আজকের দিনে অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন