প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনাকে কেন্দ্র করে ইরানের সরকার ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন (আইআরআইবি) এর মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধের উদ্ভব ঘটেছে।
একই সঙ্গে ওমানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের বক্তব্যে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
ইরানের গভর্নমেন্ট ইনফরমেশন কাউন্সিল শুক্রবার অভিযোগ করেছে যে, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের অংশকে সম্প্রচার করতে ‘সেন্সরশিপ’ করেছে।
তবে শনিবার এক বিবৃতিতে আইআরআইবি সরকারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, দেশের নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে বিভক্তির ভুল ধারণা সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনও বিষয় প্রচার না করা তাদের দায়িত্ব।
খামেনির নির্দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু: পেজেশকিয়ান
সপ্তাহের শুরুতে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, গত বছরের ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের পর তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিরোধিতা করলেও ব্যক্তিগতভাবে আলোচনার অনুমোদন দিয়েছিলেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, তিনি ও তার সহযোগীরা দেশের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে সর্বোচ্চ নেতার কাছে জানতে চান, “যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়”—এমন পরিস্থিতি দেশের জন্য ক্ষতিকর হলে কী করা উচিত।
প্রেসিডেন্টের দাবি, সর্বোচ্চ নেতা তখন তাদের আলোচনায় যাওয়ার নির্দেশনা দেন এবং সেই নির্দেশের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়।
সরকারের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ইচ্ছাকৃতভাবে এই অংশটি সম্প্রচার থেকে বাদ দিয়েছে।
সংসদ স্পিকার ও বিচার বিভাগের প্রধানের বক্তব্যও সম্পাদনা
সরকারের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এটি বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। সম্প্রতি সংসদের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের একটি সাক্ষাৎকার থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাসংক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেইয়ের একটি বক্তব্যের অংশও সম্প্রচার করা হয়নি, যেখানে তিনি প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রীয় টিভির সমালোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সমালোচনা করেছেন।
শনিবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন সময়ে ফক্স নিউজ, সিএনএনসহ বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমে তিনি ইরানের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সেই সাক্ষাৎকারগুলোর মাত্র এক-দুটি সাবটাইটেল প্রচার করেছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত মাসে স্বাক্ষরিত (বর্তমানে স্থগিত) সমঝোতা স্মারক নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে কট্টরপন্থীদের যে দাবি, তা সঠিক নয়। তার ভাষায়, তৎকালীন পরিস্থিতিতে এটিই ছিল ‘সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো চুক্তি’।
‘কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাব’ অভিযোগ সরকারের
সরকারের দাবি, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ভেতরে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকারের ইঙ্গিত ছিল অতি কট্টরপন্থী পায়দারি ফ্রন্ট-এর দিকে।
সরকার বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করতে পারে।
অন্যদিকে আইআরআইবি বলছে, বিতর্কিত অংশ প্রচার করলে দেশের নেতৃত্বে বিভক্তির ধারণা তৈরি হতো।
উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ঘোষিত ‘পবিত্র জাতীয় ঐক্য’ নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ তুলেছে।
সংসদীয় কমিটির সতর্কবার্তা
আইআরআইবির ওপর সংসদীয় তদারকি কমিটির মুখপাত্র মোহাম্মদ মিরজাই শনিবার জানান, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মতামত তুলে ধরতে এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে রক্ষণশীল সাংবাদিক মোহাম্মদ মোহাজেরি মন্তব্য করেন, আইআরআইবি এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কিন্তু সবচেয়ে কম কার্যকর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ-সাদেক জাভাদি-হেসার বলেন, “দেশে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে, আর আরেকটি সরকার হিসেবে আইআরআইবি তার বিরুদ্ধেই কাজ করছে।”
প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
সংস্কারপন্থী সংবাদমাধ্যম এন্তেখাব একটি অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আলোচনাসংক্রান্ত বক্তব্য সম্প্রচার না করায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান আইআরআইবির প্রধান পেইমান জেবেলিকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছেন।
অন্যদিকে কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মেইসাম জোহুরিয়ান দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বাজেট কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তবে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেনি।
ওমানের মধ্যস্থতায় নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ
অভ্যন্তরীণ এই বিরোধের মধ্যেই শুক্রবার ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান সফর করেন।
তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী পরিচালনা ও নিরাপত্তা। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ একটি বড় বিরোধের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্য, ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার বলেন, যুদ্ধ ‘অত্যন্ত ভালোভাবেই’ এগোচ্ছে এবং কয়েক দিনের মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন সফর করবেন।
তিনি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও অচিরেই কোনো সমঝোতা হবে বলে তিনি মনে করেন না।
এদিকে যুদ্ধ আরও তীব্র হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে ধারাবাহিক হামলার যে হুমকি তিনি দিয়েছিলেন, তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা- এ প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান ট্রাম্প।
এর জবাবে শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর বলেন, শত্রুপক্ষ সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি যুদ্ধের সময় নিহত বেসামরিক নাগরিকদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ারও অঙ্গীকার করেন তিনি। সূত্র: আল-জাজিরা
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন