প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা পাহাড়, বিস্তীর্ণ চা-বাগান, স্বচ্ছ জলের লেক এবং সবুজ অরণ্যের আকর্ষণে মৌলভীবাজার জেলা, বিশেষ করে চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকদের জন্য প্রস্তুত। টানা পাঁচ দিনের ছুটির কারণে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সাজ সাজ রব চলছে। হোটেল ও রিসোর্টে বুকিং বাড়ছে, এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাড়তি কর্মব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এবারের পূজার ছুটিতে মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্পে প্রায় ৩০ কোটি টাকার সম্ভাবনাময় বাণিজ্য হতে পারে।
১৯ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত পূজার ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের আগমন ঘটতে পারে এই অঞ্চলে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক এবং বাইক্কা বিলসহ জেলার জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি ভিড়ের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে, চা-বাগানের মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন এই অঞ্চলের পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অঞ্চলে পর্যটকদের আগমন কেবল হোটেল ও রিসোর্টের ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রেস্তোরাঁ, পরিবহন, স্থানীয় খাবার, চা-পাতা এবং হস্তশিল্পের বিক্রিসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ফলে, পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সিলেট বিভাগের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য শ্রীমঙ্গল। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সারি সারি চা-বাগান, আনারসের বাগান, বনাঞ্চল এবং লেকের নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিবছর দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এখানে আসেন। শ্রীমঙ্গলকে কেন্দ্র করে পর্যটকেরা মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন। শ্রীমঙ্গলের উল্লেখযোগ্য আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বাইক্কা বিল, মাধবপুর লেক, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, চা জাদুঘর, ভাড়াউড়া লেক, জাগছড়া লেক, চা-কন্যা ভাস্কর্য, বধ্যভূমি-৭১, ডিনস্টন সিমেট্রি, হরিণছড়া গলফ মাঠ, খাসিয়া পুঞ্জি এবং মণিপুরি ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর গ্রাম। এছাড়া, কমলগঞ্জের হামহাম জলপ্রপাত এবং ধলই চা-বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
জেলার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, রাজনগরের কমলা রানির দিঘি, কাউয়াদিঘি হাওর, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খোজার মসজিদ ও বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক এবং কুলাউড়ার গগনটিলা, কালাপাহাড় ও মূরইছড়া ইকোপার্ক। পূজার ছুটিতে এসব স্থানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, কোনো পর্যটক একদিন রাত্রিযাপন করলে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও বিনোদনসহ বিভিন্ন খাতে গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ব্যয় করতে পারেন। ফলে, রাত্রিযাপনকারী পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও তার প্রভাব পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পূজার ছুটিতে পর্যটকদের বিপুল সমাগম ঘটলে হোটেল ও রিসোর্টের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও লাভবান হবেন। তবে, ৩০ কোটি টাকার সম্ভাব্য বাণিজ্যের হিসাবটি সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশাভিত্তিক।
শ্রীমঙ্গল হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি শুরুর আগেই শ্রীমঙ্গলে পর্যটকদের আগমন শুরু হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার পর্যটকদের উল্লেখযোগ্য সমাগম হবে বলে আমরা আশা করছি। আগত অতিথিদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে নূর ফুডস রেস্টুরেন্টসহ শহরের বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার প্রস্তুতি রয়েছে।’
গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, পাহাড়ি অরণ্য ও চা-বাগানের সবুজ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকেরা বরাবরই শ্রীমঙ্গলে আসেন। পূজার ছুটিতেও এর ব্যতিক্রম হবে না। তিনি বলেন, ‘এবার পূজার ছুটি উপলক্ষে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত আমাদের রিসোর্টে শতভাগ বুকিং রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হলে এবং শমশেরনগর বিমানবন্দর পুনরায় চালু হলে এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। এতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি ছোট-বড় সব হোটেল, রিসোর্ট এবং স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উপকৃত হবে।
শ্রীমঙ্গল ট্যুরিস্ট পুলিশের ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, পূজার ছুটিতে মৌলভীবাজারে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটে। জেলার অধিকাংশ জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় থাকায় এখানে পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা, এবারের পূজার ছুটিতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার পর্যটকের সমাগম হতে পারে। পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারেন, সে জন্য আমাদের টিম সার্বক্ষণিক মাঠে দায়িত্ব পালন করবে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নির্বিঘ্ন ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপনের লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, যানজট নিরসন, জনসমাগম ব্যবস্থাপনা এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখে সবাই যেন নির্বিঘ্নে পূজার আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। শ্রীমঙ্গলকে নিরাপদ, সম্প্রীতিপূর্ণ এবং পর্যটকবান্ধব রাখতে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী দৈনিক ইনকিলাব’কে বলেন, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে পর্যটকদের আগমন ক্রমেই বাড়ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং দুর্গাপূজায় উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করতে এক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, পর্যটন খাতের উন্নয়ন এবং পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে চারবার উপস্থাপন করেছি। পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে শায়েস্তাগঞ্জের মিরপুর থেকে মৌলভীবাজার পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীত করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে সংসদ সদস্য বলেন, শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। শিগগিরই পুরো শ্রীমঙ্গল শহরকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে তিনি বলেন, পূজা উপলক্ষে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের জন্য ডিআইজির কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সমন্বয় সভা করা হচ্ছে। পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, মৌলভীবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র্যময় পর্যটন কেন্দ্র এই জেলাকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত করেছে। তবে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, মানসম্মত আবাসন, নিরাপদ পরিবহন, খাবারের মান এবং ন্যায্য ভাড়া নিশ্চিত করাও জরুরি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা, উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং পর্যটকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা গেলে মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্প কেবল ছুটিকেন্দ্রিক বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সারা বছর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন