প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বর্তমানে পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে এবং এই যুদ্ধ নতুন একটি মোড় নিয়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে ইউক্রেন ৪০ দিনের একটি বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানের অংশ হিসেবে ইউক্রেন রাশিয়ার লক্ষ্যে একের পর এক ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও ক্রেমলিন কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে, তথাপি পুতিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অনড়। তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে সরাসরি বসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের শক্তি আরো সুসংহত করার অঙ্গীকার করেছেন এবং আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার উপর জোর দিয়েছেন। ইউক্রেনের ড্রোন হামলার জবাবে রাশিয়াও আকাশ এবং স্থলপথে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
রাশিয়া যুদ্ধের প্রথম দিকে বেছে বেছে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সাবস্টেশন এবং হিটিং প্ল্যান্টগুলোতে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করার কৌশল নিয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে করা এবং বেসামরিক নাগরিকদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। এখন ইউক্রেন পাল্টা সেই কৌশল রাশিয়ার ওপর প্রয়োগ করছে। ইউক্রেন বর্তমানে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে অবস্থিত তেল শোধনাগার, তেল টার্মিনাল, নৌযান, অস্ত্র কারখানা ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রের মত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। নতুন কৌশলে তারা যথেষ্ট সফলও হয়েছে। যুদ্ধের উত্তাপ দ্বারপ্রান্তে এসে রাশিয়ার জনগণ এখন উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত। পঞ্চ বছরের যুদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর প্রচলায় চাপ সৃষ্টি করেছে, যা এখন আরো প্রবল হয়েছে। ইউক্রেন চায়, রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়াতে, যেন রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয় অথবা যুদ্ধের জন্য আরো বেশি মূল্য দিতে হয়।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়ায় এখন তেলের পাম্পে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে, যা দেশটির ইতিহাসে নজিরবিহীন। মানুষকে তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা তাদের বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন করছে। ইউক্রেনের দখল করা ক্রিমিয়ায় জ্বালানি বিক্রি স্থগিত করা হয়েছে এবং সেখানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
শুরুতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলাকে গুরুত্ব না দিলেও, এখন এমনকি পুতিন নিজেও জ্বালানি সঙ্কটের বিষয়ে স্বীকার করেছেন। জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলার জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। পুতিন প্রয়োজন হলে ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করার কথাও ভাবছেন। গত সপ্তাহে প্রধান কর্মকর্তাদের সাথে জরুরি বৈঠকে পুতিন স্বীকার করেন, জ্বালানি তেলের মজুদ অস্বস্তিকর মাত্রায় কমে এসেছে। তিনি বলেন, রাশিয়ার কৃষি খাত ঝুঁকির মুখে রয়েছে এবং ‘আমাদের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু ও অবকাঠামোয় সন্ত্রাসী হামলার প্রভাব সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।’
যুদ্ধের শুরুতে ইউক্রেন রাশিয়ার ওপর এত চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি, কারণ তাদের যুদ্ধ সক্ষমতা অনেকটাই পশ্চিমা সমর্থন নির্ভর ছিল। কিন্তু ইউক্রেন এখন ড্রোনের জন্য একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ শিল্প গড়ে তুলেছে। তারা বর্তমানে বছরে ৬০ থেকে ৭০ লাখ ড্রোন উৎপাদন করছে। সীমান্ত এলাকায় স্থলযুদ্ধে পারা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে, ইউক্রেন দূরপাল্লার ড্রোনের মাধ্যমে রাশিয়ার ভিতরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আক্রমণ করতে পারছে। সামরিক শক্তিতে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয় জেনে ইউক্রেন মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগতভাবে যুদ্ধের ময়দানে এগিয়ে থাকতে চাইছে।
যুদ্ধে ইউক্রেনের এই আপাত সাফল্য জেলেনস্কিকে কিছুটা উন্নতি দিয়েছে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি এক সময় জেলেনস্কির উপর বিরক্ত ছিলেন, তিনিও এখন তার সাহসের প্রশংসা করছেন। ন্যাটোও ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে আরো দৃঢ়ভাবে কথা বলছে। আত্মবিশ্বাসী জেলেনস্কি বলছেন, ‘সঠিক সমর্থন পেলে ইউক্রেন দ্রুত এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে রাশিয়া শান্তি বেছে নিতে বাধ্য হবে।’
কিন্তু ইউক্রেনের ড্রোন কৌশলের কাছে পুতিন নতি স্বীকার করার সম্ভাবনা কম। পুতিনকে যারা চেনেন, তারা জানেন যে চাপ দিয়ে তাকে ভাঙা যাবে না। ইউক্রেনের পাল্টা হামলার মুখে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা কিছুটা মন্থর হলেও থেমে নেই। রাশিয়া ইউক্রেনজুড়ে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং গ্লাইড বোমা হামলা অব্যাহত রাখছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিকরা হতাহত হচ্ছেন।
সব মিলিয়ে যুদ্ধ নতুন গতি পেলেও তা বন্ধের মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। গত ২৫ বছর ধরে রাশিয়ার সর্বেসর্বা ভ্লাদিমির পুতিন। কেজিবি থেকে ক্রেমলিন- সর্বত্র তার একাধিপত্য রয়েছে। সামরিক বাহিনী এবং প্রশাসনকে এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে ভেতর থেকে কোনো ঝুঁকি নেই বললেই চলে। পশ্চিমাদের বিভিন্ন অবরোধ থেকে রাশিয়ার অর্থনীতিকে রক্ষা করার জন্য পুতিন চীন, ভারত, ইরানের সাথে মিলে বিকল্প রাস্তা বের করার চেষ্টা করছেন। তারচেয়ে বড় কথা, পুতিন জানেন, তার হাতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্রই তার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। পশ্চিমারা দূর থেকে যতই জেলেনস্কিকে উসকানি দেয়, অস্ত্র দেয়; সরাসরি রাশিয়ায় হামলা চালিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধানোর ঝুঁকি কেউ নিতে চাইবে না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন