প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বর্ষা শুরু হতেই দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলের চিরচেনা আতঙ্ক বেড়িবাঁধ ভাঙন আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় নদীর তীব্র স্রোত ও জোয়ারের চাপে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে শতাধিক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। কোনো স্থানে দেখা যাচ্ছে বড় বড় ফাটল, কোথাও আবার নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বাঁধের অংশ। নদীপাড়ের হাজারো মানুষের জন্য দুর্ভোগের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানিতে বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হতে পারে।
খালনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের ঝপঝপিয়া নদীর তীরে আতঙ্ক যেন এখন নিত্যসঙ্গী হয়। নদীর পাশের বেড়িবাঁধ ভাঙছে। বর্ষার ঢেউ ও জোয়ারের চাপে প্রতিদিন ঝুঁকি বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বাঁধের পাশে দাঁড়িয়ে আক্ষেপ ও শঙ্কার সুরে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে তিন দফা নদীভাঙনে আমি নিজের বসতভিটা হারিয়ে ফেলেছি। নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় আমাদের পরিবার আবারও অন্ধকারের মুখোমুখি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগের ভাঙনে সব হারাইছি। অনেক কষ্টে আবার ঘর তুলেছি। এখন আবার বাঁধ ভাঙতেছে। রাত হলেই ভয় লাগে, কখন কী হয়।’
পানখালী ইউনিয়নে এই সমস্যা শুধু সীমাবদ্ধ নেই, দাকোপ উপজেলার জাবেরের খেয়াঘাট, লক্ষীখোলা ও নলডাঙ্গাসহ অন্তত ১০টি পয়েন্টে ভাঙনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। পাইকগাছার দেলুটি ও লতা ইউনিয়ন, কয়রার মহেশ্বরীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর পাড় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফুর বলেন, ‘জোয়ারের সময় ঘুম আসতে চায় না। যদি বাঁধ ভেঙে যায়, তবে ঘের, জমি, বাড়িঘর সব শেষ হয়ে যাবে। তাই আমি প্রায়ই রাত জেগে বাঁধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করি।’ পানখালীর আরেক বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন, ‘আইলা আর আম্পানের সময় যা কষ্ট হয়েছে, তা আমি এখনো ভুলতে পারি না। আকাশে মেঘ দেখলেই ভয় লাগে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই স্থানে ভাঙন দেখা দিলেও স্থায়ী সমাধান হয় না। সাময়িক মেরামতের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু পরবর্তী বর্ষায় আবারও দেখা দেয় সেই একই সমস্যা। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই তাদের কাছে নতুন দুর্যোগের বার্তা নিয়ে আসে।
এছাড়া খুলনার পাশাপাশি বাগেরহাটের সরনখোলা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই দুই জেলায় আরও ৬০ কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত মন্তব্য করেছেন, উপকূলীয় এলাকার বাস্তবতা মেনে নিয়ে পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই উপকূল সুরক্ষায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।
তবে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহির মাজহার জানান, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার ও মেরামতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণে কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় তাদের আওতায় প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর একটি বড় অংশ নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন।
প্রতি বছর উপকূল রক্ষায় নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, ব্যয় হয় শতশত কোটি টাকা। কিন্তু নদীপাড়ের মানুষের প্রশ্ন একটাই, এই বর্ষায় বাঁধ টিকবে তো? কারণ বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু মাটি বা ইটের কাঠামো ভাঙে না, ভেঙে পড়ে মানুষের স্বপ্ন, জীবিকা ও নিরাপত্তাবোধও। তাই সাময়িক সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে উপকূলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি টেকসই, কার্যকর ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে দুর্ভোগের এই চক্র থেকে মুক্তির আগ্রহ তারা পোষণ করছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন