প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ১২:০১ এম || প্রকাশের তারিখঃ ২১শে আগস্ট, ২০২৬ইং; ০৪:১৮ পি.এম
শতপ্রতিকূলতা ও দূর্নীতিকে মোকাবেলা করে নিজেকে সততার মাঝে বিলিয়ে দিয়ে কিভাবে দায়িত্বপালন ও সেবা করা যায় সেটি করে দেখালেন জিয়ানগরের সদ্যবিদায়ী ইউএনও হাসান মোঃ হাফিজুর রহমান। চাকরিজীবনে প্রথমবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলায় ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি যোগদান করেন। এরপর ৯ মাস জিয়ানগর উপজেলায় ইউএনও হিসেবে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
বৃহস্পতিবার ছিল জিয়ানগরে তাঁর শেষ কর্মদিবস। এ উপলক্ষে উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁকে হাসিমুখে বিদায়ী সংবর্ধনা দেন। বিদায়ের মুহূর্তে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সহকর্মীরা তাঁর সঙ্গে দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন স্মৃতি স্মরণ করে নতুন কর্মস্থলে তাঁর সফলতা কামনা করেন।
জিয়ানগরে প্রথমবার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে স্বল্প সময়ের মধ্যেই নাগরিক সেবা সহজীকরণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, পরিচ্ছন্নতা, খেলাধুলা, শিশুদের বিনোদনের পরিবেশ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন হাসান মোঃ হাফিজুর রহমান।
ইউনিয়ন পর্যায়ে নাগরিক সেবা বিকেন্দ্রীকরণ
নাগরিকদের আলাদা আলাদা আবেদন দাখিলের পরিবর্তে নির্ধারিত ফরমে আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থা করে উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন নাগরিক সেবা ইউনিয়ন পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইউনিয়ন পরিষদ ও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোকে সেবা প্রদানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজে লাগানোর ফলে সাধারণ মানুষের উপজেলা সদরে বার বার যাতায়াতের প্রয়োজন কমেছে।
এতে প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা নিতে মানুষের সময়, শ্রম ও যাতায়াত খরচ সাশ্রয় হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
সরকারি সহায়তার আবেদনেও স্বচ্ছতার উদ্যোগ
রেইন ওয়াটার হারভেস্টার (পানির ট্যাংকি), আর্থিক সহায়তা, জাকাত, শুকনো খাবার, টিন, সেলাই মেশিন ও আবাসনের ফাঁকা ঘর বরাদ্দ সহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তার আবেদন নির্ধারিত ফরমে সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়। এসব আবেদন উপজেলার ওয়েবসাইটে দেয়া আছে যার মাধ্যমে অনলাইনে যে কেউ আবেদন করতে পারেন।
এসব আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে সভার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আবেদনকারীদের ফলাফল জানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেবার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্প, প্রকল্পের ব্যয়, বাজেট এবং নিয়োগের ফলাফল নিয়মিত ওয়েবসাইটে প্রকাশের উদ্যোগও নেওয়া হয়। এর ফলে সরকারি কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের জানার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পাঁচ ইউনিয়নে ১৭ পদে গ্রাম পুলিশ নিয়োগ
ইউএনও হাসান মোহাম্মাদ হাফিজুর রহমানের দায়িত্বকালীন উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ১৭টি শূন্যপদে বিনা টাকায় গ্রাম পুলিশ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখায় নিয়োগ কার্যক্রমটি স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হয়।
পরিচ্ছন্নতায় বিশেষ গুরুত্ব
দায়িত্ব পালনকালে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। হাট-বাজার ও ফেরিঘাটের পাবলিক বাথরুম পরিষ্কার করে ব্যবহার উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাইলট ভিত্তিতে উপজেলার পাঁচটি বিদ্যালয়ে ময়লা ব্যবস্থাপনার জন্য উন্নত ডাস্টবিন, হ্যান্ড গ্লাভস ও ময়লার ঝুড়িসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে।
অভিযোগ জানাতে ডাকবক্স
সাধারণ নাগরিকদের আবেদন ও অভিযোগ সরাসরি প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে উপজেলার বিভিন্ন অফিসে স্বচ্ছ ডাকবক্স স্থাপন করা হয়। এসব ডাকবক্সে সাধারণ মানুষ তাঁদের আবেদন, অভিযোগ ও বিভিন্ন বিষয়ে মতামত জমা দিতে পারবেন।
প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ আরও সহজ করা এবং নাগরিকদের কথা সরাসরি প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ, টিআর কাবিখা ও বিশেষ বরাদ্দের কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ, কে কোন প্রকল্পের সভাপতি এসকল তথ্য নিয়মিতভাবে উপজেলার ওয়েবসাইটে দেয়া হতো। এতে করে সাধারণ লোকজন প্রকল্প সম্পর্কে জানতে পারতো এবং কাজের মান তদারকি করতে পারতো এবং কাজে অনিয়ম হলে অভিযোগ করতে পারতো। জানা গেছে বর্তমান ইউএনও আসার পর সকল প্রকল্পে ১ নম্বর ইট দিয়ে কাজ করা নিশিত করা হয়েছে। এতে করে স্থানীয় উন্নয়ন কাজের স্থায়িত্ব বেড়েছে।
শিশুদের বিনোদন ও খেলাধুলায় উদ্যোগ
শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য উপজেলায় দুই থেকে তিনটি স্থানে পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রায় দুই একর সরকারি জমি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা ওই জমিতে বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে উপজেলার বিভিন্ন খেলার মাঠ খেলাধুলার উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমী ও তরুণদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে।
জাপানে উচ্চশিক্ষা শেষে প্রশাসনে কর্মজীবন
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের আগে উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে ছিলেন হাসান মো: হাফিজুর রহমান। সেখানে তিনি অর্থনীতিতে ২ বছর মেয়াদী মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে প্রশাসনের দায়িত্বশীল পদে কর্মজীবন অব্যাহত রাখেন তিনি।
তাঁর জন্মস্থান গাইবান্ধা জেলায়। তাঁর পিতা মো. আমিনুল ইসলাম।
কৃষি ও মৎস্য খাতে সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আহ্বান
জিয়ানগর উপজেলার জনগণকে খুবই সাধারণ ও আন্তরিক উল্লেখ করে বিদায়ী ইউএনও হাসান মো: হাফিজুর রহমান বলেন, এ উপজেলায় কৃষি ও মৎস্য চাষে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং নতুন নতুন ব্যবসা ও উদ্যোক্তা তৈরি করা গেলে জিয়ানগরের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা তৈরির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি ও মৎস্য খাতকে আধুনিক ও বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নতুন নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে জিয়ানগরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
সাংবাদিকদের সহযোগিতার কথা স্মরণ
বিদায় উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় ইউএনও হাসান মোহাম্মাদ হাফিজুর রহমান বলেন, “এতদিন আপনাদের উপজেলায় কাজ করতে পেরে বেশ ভালো লেগেছে। আগে উপজেলায় কাজ করার সুযোগ ছিল না বিধায় এখানে এসে কাজ করাটা বেশ চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিল। তবে এখানে যে সকল সাংবাদিকবৃন্দ রয়েছেন তারা সকলেই আন্তরিক এবং প্রশাসনের সকল কাজে সহযোগিতা করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আপনাদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ। আপনারা সকলে ভালো থাকবেন। আমার এবং আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন।”
আগামী সপ্তাহে বরগুনার আমতলী উপজেলায় নতুন কর্মস্থলে যোগদান করবেন ইউএনও হাসান মো: হাফিজুর রহমান।
চাকরিজীবনে প্রথমবার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া জিয়ানগরে প্রায় নয় মাসের কর্মকাল শেষে বিদায় নিলেন তিনি। নাগরিক সেবা সহজীকরণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, পাঁচ ইউনিয়নে ১৭টি শূন্যপদে গ্রাম পুলিশ নিয়োগ, ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জনবল নিয়োগ, পরিচ্ছন্নতা, খেলার মাঠ উন্নয়ন, সরকারি জমি দখলমুক্তকরণ এবং শিশুদের বিনোদনের পরিবেশ তৈরিসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে তাঁর দায়িত্বকাল জিয়ানগরের প্রশাসনিক কার্যক্রমে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন