প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর্জি জানিয়েছে তুরস্ককে এফ-থার্টি ফাইভ যুদ্ধবিমান না দেওয়ার জন্য। এতে দেখা যাচ্ছে, কেন তেল আবিব বাধা দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, যদি আঙ্কারা মার্কিন এই যুদ্ধবিমান পায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ পরিবর্তিত হতে পারে। এর ফলে অঞ্চলটিতে দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের প্রভাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে আঙ্কারার কাছে এফ থার্টি ফাইভ যুদ্ধবিমান বিক্রির ইঙ্গিত রেখেছে। তবে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তুরস্ককে যুদ্ধবিমান না দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠছে যে, তুরস্ককে এফ থার্টি ফাইভ দেওয়া হলে ইসরাইলের সমস্যা কোথায় তৈরি হবে।
বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধুমাত্র যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয় নয়। বরং এর সঙ্গে রয়েছে বাণিজ্যিক, জ্বালানি, আকাশসীমা এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের লড়াই। যদি তুরস্ক মার্কিন এই যুদ্ধবিমান পায়, তাহলে পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে।
ইসরাইলের সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তি দীর্ঘদিন ধরে আকাশে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। সিরিয়া, লেবানন কিংবা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে যে কোনও অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিগত সুবিধার ওপর নির্ভর করে তেল আবিব। যদি তুরস্ক এফ-থার্টি ফাইভ পায়, তবে তাদের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এতে ওই অঞ্চলে ইসরাইলের কৌশলগত স্বাধীনতা এবং আকাশ প্রতিরক্ষায় শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
ইসরাইলের প্রতি যুদ্ধবিমান না দেয়ার পেছনে বাণিজ্যিক কারণও রয়েছে। ভারতে আই.এম.ই.সি করিডোর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যা ভারতকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান এবং ইসরাইল হয়ে ইউরোপের দিকে নিয়ে যাবে। ভারতের জন্য এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোডের বিকল্প হবে, আর ইসরাইলের জন্য এটি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লাইফলাইন হয়ে দাঁড়াবে।
কিন্তু, তুরস্ক এই অর্থনৈতিক করিডোরের বাইরে পড়ে। তাই, আঙ্কারা ইরাক হয়ে নিজস্ব উন্নয়ন রোড করিডোর তৈরি করতে চায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আঙ্কারা ও তেল আবিব শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয় বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
জ্বালানির রাজনীতি এখানে ধরা পড়ছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরাইলের লেভিয়াথন, তামারা ও সাইপ্রাসের আফ্রোদিতি গ্যাসক্ষেত্র ইউরোপের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই অঞ্চল নিয়ে তুরস্ক, গ্রিস এবং সাইপ্রাসের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলমান রয়েছে। তাই, তুরস্ক শক্তিশালী হলে এই গ্যাস রুট ও জ্বালানি প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে ইসরাইলের উদ্বেগ বাড়বে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এক দশকে ভারত ও ইসরাইলের সম্পর্ক প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং আইএমইসিকে কেন্দ্র করে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। অপরদিকে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যেও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে তুরস্ক প্রায়ই পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করে, আর ইসলামাবাদও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে আঙ্কারার পাশে থাকে। তুরস্ক যদি এফ থার্টি যুদ্ধবিমান পায়, তবে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বাড়বে। সেইসাথে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক বরাবরই বৈরি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ন্যাটোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তুরস্ককে নিজের কৌশলগত বলয়ে রাখতে চায়, অন্যদিকে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার নীতিও ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদী হবে। তাই, এফ-থার্টি ফাইভ ইস্যু শুধুমাত্র অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্য, বাণিজ্য করিডোর, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন