প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর আদায়ের পরিকল্পনা থেকে সরকার পিছু হটেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব ব্যক্তিগত এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত গরিবের যানবাহনে কোনো ধরনের কর আর থাকছে না।
সাধারণ মানুষের করের বোঝা লাঘব করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে গত মে মাসের ১২ তারিখে কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ‘বাইকের চাকা ঘুরলেই কর’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয় এবং এর পর থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ঘেরাও, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি জমা দেন মোটরসাইকেল চালকরা।
তারা এই বিষয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে মোটরসাইকেল এখন শুধু শখের বাহন নয়, এটি দৈনন্দিন যাতায়াত ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং রাইড শেয়ার চালকরা সময় বাঁচাতে ও যানজট এড়াতে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে অনেক নারীও ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল ব্যবহার করে নিরাপদ এবং স্বাধীনভাবে চলাচল করছেন।
মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা এরই মধ্যে নিবন্ধন ফি, রোড ট্যাক্স, ফিটনেস, বীমা ও জ্বালানির ওপর বিদ্যমান কর পরিশোধ করছেন। যদি নতুন করে অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হয়, তাহলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা থেকে সরকার অগ্রিম আয়কর বাবদ অন্তত দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায় করতে পারত। প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে অবহিত করেছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং সংস্থাটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই প্রস্তাবে সায় দিয়েছিলেন।
তবে জনভোগান্তির বিষয়টি মাথায় রেখে, প্রধানমন্ত্রী প্রথমে কর কমিয়ে অর্ধেক এবং পরে এই কর বাতিলের নির্দেশনা দেন। তবে ১৫০ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের মালিকদের বাধ্যতামূলকভাবে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নিতে হবে।
বর্তমানে শুধু সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, জিপ, বাস, ট্রাক এবং পিকআপের মতো যানবাহনের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর নেওয়া হয়। মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় আগে কখনো অগ্রিম আয়কর ছিল না। তবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিসিভেদে মোটরসাইকেলে বছরে দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা এবং এলাকাভেদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা কর আরোপের পরিকল্পনা ছিল।
সূত্র জানায়, ১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের জন্য বছরে দুই হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের জন্য বছরে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে এই করের হার কমিয়ে এক হাজার, তিন হাজার এবং পাঁচ হাজার নির্ধারণ করা হয়।
বর্তমানে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এককালীন নিবন্ধন ফি এবং দুই বছর পর পর রোড ট্যাক্স দিতে হয়। ৫০ থেকে ১২৫ সিসির মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি ৯ হাজার ২৯১ টাকা। এরপর প্রতি দুই বছর পর পর এক হাজার ১৫০ টাকা রোড ট্যাক্স দিতে হয়। ১২৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি ১১ হাজার ৭৬৪ টাকা এবং প্রতি দুই বছর পর পর দুই হাজার ৩০০ টাকা রোড ট্যাক্স দিতে হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৮০। সংস্থাটির কাছে সিসি-ভিত্তিক নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ১১০ সিসি বা এর নিচের মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১০ লাখ ধরে হিসাব করলে, করযোগ্য মোটরসাইকেলের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ লাখ। গড়ে প্রতিটি মোটরসাইকেল থেকে চার হাজার টাকা করে কর আদায় করা হলে সরকারের কোষাগারে বছরে প্রায় এক হাজার ৫২০ কোটি টাকা যোগ হতো।
তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর দুই হাজার ৫০০ টাকা। সিসিভেদে প্রাইভেট কার ও জিপের জন্য এই কর ২৫ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। দোতলা বাস, এসি মিনিবাস ও কোস্টারের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা, ৫২ আসনের বেশি বাসে ২৫ হাজার টাকা এবং এর কম আসনের বাসে ২০ হাজার টাকা কর দিতে হয়। এসি বাসে ৫০ হাজার টাকা এবং নন-এসি মিনিবাস বা কোস্টারের ক্ষেত্রে ১২ হাজার ৫০০ টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারিত আছে।
এ ছাড়া পাঁচ টনের বেশি ধারণক্ষমতার ট্রাক, লরি ও ট্যাংকলরিতে ৩০ হাজার টাকা, দেড় থেকে পাঁচ টন ওজনের যানবাহনে ১৫ হাজার টাকা এবং দেড় টনের কম ওজনের যানবাহনে সাড়ে সাত হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। পিকআপ ভ্যান, হিউম্যান হলার ও থ্রি-হুইলারের ক্ষেত্রেও সাড়ে সাত হাজার টাকা কর দিতে হয়। বিআরটিএ ফিটনেস নবায়নের সময় এসব কর আদায় করে থাকে।
বাংলাদেশে গত এক দশকে মোটরসাইকেল শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ হয়েছে। হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি, বাজাজ এবং টিভিএসের বিভিন্ন মডেল দেশে সংযোজন করা হচ্ছে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হলে মোটরসাইকেলের বিক্রি ও উৎপাদন কমে যেতে পারে। ফলে নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার করও বাতিল : মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল সরকারের।
সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী অটোরিকশার ক্ষেত্রে বছরে পাঁচ হাজার টাকা, পৌরসভা এলাকায় দুই হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে এক হাজার টাকা কর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে এই করও বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা না থাকায়, রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঠিক সংখ্যা নেই। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, দেশে অন্তত ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতেই চলছে ১২ থেকে ১৫ লাখ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন