প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিমান যোগাযোগে ব্যাপক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের কাজ বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন টার্মিনালের পরীক্ষামূলক চালু সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে, মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের সঙ্গে কক্সবাজারের সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে এয়ার এশিয়া। পাশাপাশি নেপালের কাঠমান্ডু, চীনের কুনমিং এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগও চলছে বলে জানা গেছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, এয়ার এশিয়া কক্সবাজারে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করবে বলে নিশ্চিত করেছে। প্রস্তাবিত এই রুট চালু হলে কক্সবাজার সরাসরি মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। তবে, ফ্লাইট চালুর নির্দিষ্ট তারিখ ও সপ্তাহে কতটি ফ্লাইট পরিচালিত হবে, তা এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজার বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে দেশীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীলতা কমে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তত্ত্বাবধানে কক্সবাজার বিমানবন্দরে নির্মিত হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের আধুনিক যাত্রী টার্মিনাল। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
নতুন টার্মিনালে চেক-ইন কাউন্টার, ইমিগ্রেশন, লাগেজ সরবরাহের বেল্ট, নিরাপত্তা তল্লাশি, লিফট, এসকেলেটর ও বোর্ডিং ব্রিজসহ আধুনিক যাত্রীসেবা সুবিধা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর আগে নতুন টার্মিনাল থেকে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদেরও সেবা দেওয়া হচ্ছে।
বেবিচকের সদস্য (অপারেশন্স অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু না হওয়া পর্যন্ত নতুন টার্মিনালে প্রাথমিকভাবে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের সেবা দেওয়া হবে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ যাত্রী ব্যবস্থাপনা সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হবে।
নতুন টার্মিনাল চালু হলে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের আগমন-বহির্গমন এখান থেকেই সম্পন্ন হবে। অভ্যন্তরীণ যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে চেক-ইন সম্পন্ন করে পুরনো টার্মিনালের মাধ্যমে বিমানে উঠবেন।
টার্মিনাল সম্প্রসারণের ফলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী পরিচালন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। আগে যেখানে বছরে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা ছিল, সম্প্রসারণের পর তা প্রায় ১৮ লাখে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে টার্মিনালে আধুনিক ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা ও লাগেজ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উড়োজাহাজে সরাসরি ওঠানামার জন্য বোর্ডিং ব্রিজ স্থাপন করা হয়েছে।
শুধু টার্মিনাল নয়, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী করে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়েও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ফুট থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা হয়েছে।
এই রানওয়ের একটি বড় অংশ তৈরি হয়েছে সাগরের পানির ওপর। এখানে বিমান অবতরণ করলে মনে হবে, যেন পানির ওপরই বিমান নেমেছে।
বর্ধিত এই রানওয়ে বর্তমানে দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহৃত বড় উড়োজাহাজ, এমনকি ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করে রানওয়েটি উন্নত করা হয়েছে।
ফলে কক্সবাজার বিমানবন্দরে দেশীয় উড়োজাহাজের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, পেনাংয়ের পাশাপাশি কক্সবাজার-কাঠমান্ডু-কক্সবাজার রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কুনমিং রুটের মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের পর্যটকদের কক্সবাজারে আকৃষ্ট করার লক্ষ্য রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গেও সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা সরকার পর্যালোচনা করছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব আন্তর্জাতিক রুট চালু হলে কক্সবাজার শুধু সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক দেশীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও বিমান যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবেও বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ চালু হলে বিদেশি পর্যটকের পাশাপাশি পর্যটন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও বাড়বে। আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ট্যুর অপারেটর, বিনোদন ও অন্যান্য পর্যটনসেবায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এতে পর্যটন খাতে আরো বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বলেন, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে টেকসই করতে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের নিয়মিত কার্যক্রম, যৌক্তিক বিমানবন্দর ফি এবং পর্যটন গন্তব্যের সার্বিক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোর আগ্রহকে নিয়মিত ফ্লাইটে রূপ দেওয়া, পর্যটকসেবার মান বাড়ানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য সমন্বিত পর্যটন প্যাকেজ চালু করা প্রয়োজন। তাহলেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের সম্প্রসারিত অবকাঠামোর সুফল পর্যটন খাতে কার্যকরভাবে পাওয়া সম্ভব হবে।
কক্সবাজারে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বনাঞ্চল, দ্বীপ, দীর্ঘ মেরিনড্রাইভ ও সামুদ্রিক পর্যটনের বিস্তৃত সম্ভাবনা। এতদিন আন্তর্জাতিক পর্যটকদের বড় অংশকে ঢাকা হয়ে কক্সবাজারে আসতে হতো। সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর সুযোগে বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ সময় ও সংযোগের জটিলতা কমবে।
এয়ার এশিয়ার পেনাং-কক্সবাজার রুট চালুর উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কাঠমান্ডু, কুনমিং ও মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য রুট চালু হলে কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজার আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে আশা করা হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কক্সবাজারের সক্ষমতা কাজে লাগাতে বিমান যোগাযোগের পাশাপাশি পর্যটন অবকাঠামো, পরিবেশ সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, যাতায়াতব্যবস্থা, পর্যটকসেবার মান এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কক্সবাজারকে একটি টেকসই আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন