প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা বর্ষায় প্রকৃতি যখন রুদ্ররূপ ধারণ করে, তখনই ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়ে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র সাগরকন্যা কুয়াকাটা। বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত ভাঙনে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে সৈকতের প্রস্থ। একই সঙ্গে বিলীন হচ্ছে উপকূলীয় বনাঞ্চল ও বিভিন্ন স্থাপনা। এতে ধীরে ধীরে অস্তিত্বের সংকটে পড়ছে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন অবকাঠামো।
সৈকতের ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ব্যবহারের উদ্যোগ নিলেও এতে স্থায়ী সমাধান মিলছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের দাবি, এসব উদ্যোগে সাময়িকভাবে ভাঙন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বরং অপরিকল্পিতভাবে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ব্যবহারের কারণে সৈকতের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও নান্দনিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু ভাঙন ঠেকাতে সাময়িক সংস্কার বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। সমুদ্রের ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে কুয়াকাটার সৈকত ও পর্যটন অবকাঠামো রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।
জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে কুয়াকাটাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। সে সময় লেম্বুরবন থেকে গঙ্গামতির পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকতের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ কিলোমিটার। সময়ের সঙ্গে পশ্চিমে তিন নদীর মোহনা থেকে পূর্বে রামনাবাদ মোহনা পর্যন্ত সৈকতের বিস্তৃতি বেড়ে বর্তমানে প্রায় ২৯ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। তবে এর বিপরীত চিত্র সৈকতের প্রস্থে। প্রতিবছর ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সাগরের প্রবল ঢেউয়ে বালু ক্ষয়ে সৈকত ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় কুয়াকাটা সৈকতে ছিল বড় বড় বালুর টেক ও বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল। সমুদ্রের কাছে যেতে দুই থেকে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। এখন সেই সমুদ্র এসে পৌঁছেছে লোকালয়ের একেবারে কাছে। এতে কুয়াকাটার অস্তিত্ব ও পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তাদের দাবি, গত ৪০ থেকে ৫০ বছরে সমুদ্র প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার ভেতরের দিকে এগিয়ে এসেছে। অব্যাহত ভাঙনে গত এক দশকে বিলীন হয়েছে নারিকেলবাগান, এলজিইডির ডাকবাংলো, ডিসি পার্কের একাংশ, পূর্বের জাউবাগান, ভূমি অফিসের গেস্টহাউস, হোটেল-মোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে হারিয়ে গেছে বহু মানুষের ঘরবাড়ি। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মৌসুম এলেই সমুদ্র যেন লোকালয়ের দিকে আরও এগিয়ে আসে।
দূরদূরান্ত থেকে কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকেরাও সৈকতের বর্তমান চিত্র নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন। আরফাত নামের এক পর্যটক বলেন, ‘দূরদূরান্ত থেকে কুয়াকাটায় এসে সৈকতের বর্তমান চিত্র দেখে আমরা হতাশ। সৈকত রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
পর্যটনকর্মী জনি আলমগীর বলেন, সাগরের উত্তাল ঢেউ একের পর এক সৈকতে আছড়ে পড়ছে। এতে একদিকে বালুক্ষয় হচ্ছে, অন্যদিকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। দ্রুত ভাঙন রোধ ও সৈকত নিরাপদ করার ব্যবস্থা না নিলে পর্যটন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, ‘কুয়াকাটার সৌন্দর্য ও পর্যটন অবকাঠামো রক্ষায় সাময়িকভাবে মেরামত করলে হবে না। সাগরের ঢেউয়ের চাপ বিবেচনায় নিয়ে টেকসইভাবে সৈকত রক্ষা ও বাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।’
পরিবেশকর্মী মেজবাহ উদ্দিন মাননু বলেন, গত ২০ বছর ধরে কুয়াকাটা সৈকতের ১৮ কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পটি এখনো ঝুলে আছে। আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে কুয়াকাটাকে গড়ে তুলতে হলে দ্রুত সৈকত রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, ম্যানগ্রোভ ও নন-ম্যানগ্রোভ—দুই ধরনের বনাঞ্চলই এখন হুমকির মুখে। ইতিমধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ বনাঞ্চল বিলীন হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ্ আলম বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০২৪ সালে ৭৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আপাতত জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে জিও টিউব ব্যবহার করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন