প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা পদত্যাগ করেছেন, যা ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ও ভয়াবহ আর্থিক সংকটের প্রেক্ষিতে ব্যাপক গণবিক্ষোভের ফলস্বরূপ। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) তার পদত্যাগের ঘোষণা আসে, যখন দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক উয়েনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায় এবং লাখ লাখ গ্রাহকের আমানত আটকে যায়।
উয়েনো ব্যাংক, যা পেনার সরকারের সময়ে একটি অপরিচিত ডিজিটাল ব্যাংক থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, দাবি করে যে প্যারাগুয়ের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ তাদের গ্রাহক। ব্যাংকটির দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে, পেরুর কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত সোমবার (২ নভেম্বর) সেটাকে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার আওতায় নেয়। এর ফলে ব্যাংকটির প্রায় ৩০ লাখ গ্রাহকের আমানত আটকে যায়।
এ অবস্থায়, কয়েক লাখ পরিবার তাদের জমানো টাকা তুলতে পারছে না, যা খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ব্যাপক বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে আসে। ব্যাংকটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
৪৭ বছর বয়সী অর্থনীতিবিদ পেনা ২০২৩ সালের আগস্টে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এবং তার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত ছিল। তবে ব্যাংক কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। বৃহস্পতিবার, তার পদত্যাগের দাবিতে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। একই দিন, আইনপ্রণেতারা ব্যাংক সংকটে অব্যবস্থাপনা ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ তুলে সর্বসম্মতিক্রমে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে ভোট দেন।
পেনা পদত্যাগের ঘোষণা দেন চাপের মুখে। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, আজ আমি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোর একটিতে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। প্যারাগুয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং এই বিশ্বাস থেকে যে প্রজাতন্ত্র সব সময় যেকোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে থাকা উচিত, আমি প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
যেভাবে বড় ব্যাংকে পরিণত হয় উয়েনো
১৯৭০-এর দশকে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে উয়েনো ব্যাংক। ২০২১ সালে প্যারাগুয়ের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক ও শিল্পগোষ্ঠী গ্রুপো ভাসকেজ এটি কিনে নেয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে পেনার সরকারের আমলে, ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পায়।
ব্যাংকটি দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণ করে এবং মুদি পণ্য কেনাকাটায় আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাক সুবিধা দিয়ে গ্রাহক বাড়ানোর পাশাপাশি প্যারাগুয়ের জাতীয় ফুটবল দলের পৃষ্ঠপোষকতাও করে। গত বুধবার (৪ নভেম্বর), দেশের জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়েরা সরকারের পাশাপাশি বিচার বিভাগের কাছে এ ঘটনায় ‘জোরালো পদক্ষেপ’ নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকটি সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও পেনশন তহবিলের ৮০ কোটি থেকে ৮৫ কোটি ডলার পর্যন্ত আমানত পরিচালনা করত, যার মধ্যে অবসরভাতা তহবিলও ছিল। পেনার সঙ্গে ব্যাংকটির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান উয়েনো হোল্ডিংয়ের পূর্ববর্তী শেয়ার সম্পর্ক থাকায়, সরকারি অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে জমা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ ওঠে।
পেনা দাবি করেন, অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি কেবল একটি বিনিয়োগ করেছিলেন এবং ইতোমধ্যে তার সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে সরকারি ও পেনশন তহবিলের অর্থ ব্যাংকটিতে জমা রাখার ক্ষেত্রে অনিয়ম ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সামনে এলে, তিনি এটাকে তার সরকারকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত ‘মিথ্যা সংবাদমাধ্যম প্রচারণা’ বলে অভিহিত করেন।
নিজ দলের নেতারাও চান অভিশংসন
গত বুধবার, বিরোধী দলের আইনপ্রণেতাদের পাশাপাশি পেনার নিজ দল কলোরাডো পার্টির কয়েকজন সদস্যও তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব আনেন। ব্যাংকটির পরিচালনাকারী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর শেয়ারহোল্ডার ছিলেন পেনা, এবং গত বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত ওই গোষ্ঠীতে তার শেয়ার ছিল বলে জানা গেছে।
এছাড়া, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংকটির কার্যক্রম নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে দেওয়া সতর্কবার্তাগুলো তিনি উপেক্ষা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ে। পেনার সাবেক মিত্র ও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হোরাসিও কার্তেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অভিশংসনের পক্ষে অবস্থান জানান।
কার্তেস লেখেন, ‘সরকারি, বেসরকারি ও অবসরভোগীদের অর্থ চুরির পক্ষে আমরা দাঁড়াব না। আমাদের জনগণের কথা ভাবতে হবে এবং কলোরাডো পার্টির যে মূল্যবোধ আমরা ধারণ করি, তা রক্ষা করতে হবে। প্রজাতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য আমরা প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার অভিশংসনকে সমর্থন করছি।’
এরপর দলের আরও কয়েকজন আইনপ্রণেতা অভিশংসনের পক্ষে অবস্থান নেন। এই পরিস্থিতিতে পেনা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘দেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার কথা বিবেচনা করেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো সময়ে আমি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে থাকলে তাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। তবে এই মুহূর্তে আমার একমাত্র অগ্রাধিকার হলো সেই প্যারাগুয়েবাসীর মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করা, যারা আমাদের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখে নিজেদের সঞ্চয় জমা রেখেছিলেন। আমার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, তাদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা।’
কেলেঙ্কারির ঘটনা সামনে আসার পর থেকে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও বিবৃতিতে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন পেনা। তবে বিরোধী দলের সিনেটর রাফায়েল ফিলিজোলা ঘটনাটিকে দেশটির গণতান্ত্রিক যুগের সবচেয়ে বড় আর্থিক জালিয়াতি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি ১০২০ এএম রেডিওকে বলেন, ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তৈরি করা একটি ব্যাংক এটি। রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত ব্যবসায় সরকারি অর্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই ব্যাংকটি গড়ে তোলা হয়েছিল। আর এর নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট।’
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র পেনা
সাবেক অর্থমন্ত্রী পেনা ‘সমৃদ্ধ প্যারাগুয়ে’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া লাতিন আমেরিকার অল্প কয়েকজন প্রেসিডেন্টের একজন ছিলেন তিনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ ওয়াশিংটনের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা পেনাকে বারবার ‘কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন সফরও করেন তিনি। তবে পেনার পদত্যাগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প বা রুবিওর পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য আসেনি।
কে হচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট?
পেনার পদত্যাগের পর তার স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নিয়ম অনুযায়ী, তার পদত্যাগপত্র প্রথমে কংগ্রেসে গৃহীত হতে হবে। সেটি অনুমোদিত হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেবেন। তবে উয়েনো ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে আলিয়ানারও সম্পৃক্ততার সন্দেহ রয়েছে। যদিও তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পেনার পদত্যাগের ঘোষণার প্রায় এক ঘণ্টা পর দেশটির নিম্নকক্ষ সর্বসম্মতিক্রমে তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব অনুমোদন করে। এখন প্রস্তাবটি সিনেটে পাঠানো হবে।
অভিশংসন প্রস্তাব সিনেটে অনুমোদিত হলে পদত্যাগের পরও পেনা তার সিনেট সদস্যপদ হারাতে পারেন। এর ফলে সংসদ সদস্য হিসেবে পাওয়া আইনি দায়মুক্তিও আর থাকবে না। তখন সাধারণ আদালতে তার বিরুদ্ধে যেকোনো ফৌজদারি মামলার বিচার পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন