প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরানের সাথে যুদ্ধ থামানোর একটি প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে যাওয়ার পর, ১ জুন সোমবার রাতে ট্রাম্প, নিজেকে শান্ত করতে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে এক হুলস্থুল পোস্টের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন।
সোমবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে ৭৯ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি ফোনালাপের গোপন ও কড়া কথোপকথন ফাঁস হয়ে যায়। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্পের এই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, “তুমি একটা আস্ত পাগল। আমি না থাকলে তুমি এতদিনে জেলেই থাকতে। আমি তোমার পিঠ বাঁচাচ্ছি। এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। এসবের জন্য পুরো বিশ্ব এখন ইসরায়েলকে ঘৃণা করছে।”
আধ ঘণ্টায় ৪৭ পোস্ট!
সোমবার রাত সোয়া ৯টার পরপরই ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে সক্রিয় হন। শুরুতেই তিনি তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বর্ণবাদ-বিরোধী এক বক্তব্যের প্রশংসা করে ফক্স নিউজের একটি নিবন্ধ শেয়ার করেন।
এরপরই শুরু হয় ট্রাম্পের আঙুলের ঝড়। মাত্র ৩১ মিনিটের ব্যবধানে তিনি ঝড়ের গতিতে ৪৭টি পোস্ট করেন। এমনকি এই উন্মাদনার চরম মুহূর্তে, একটি মিনিটের মধ্যেই তিনি একাধিক পোস্ট করে বসেন। এই প্রাথমিক ঝড়ের পর, মধ্যরাত পর্যন্ত তিনি মাঝেমধ্যেই টুকটাক পোস্ট করতে থাকেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবসময় সক্রিয় থাকা এই প্রেসিডেন্টের জন্য মাসের শুরুটা বেশ জমজমাটই বলা চলে। কারণ, এর আগে শুধু মে মাসেই তিনি ট্রুথ সোশ্যালে অবিশ্বাস্য রকমের ৮৬১টি পোস্ট করেছিলেন!
গত শনিবারও তিনি ছয় ঘণ্টায় ৫২টি পোস্ট করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল মিম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি অদ্ভুত সব কন্টেন্ট, রাজনৈতিক আক্রমণ এবং ভক্তদের বানানো প্রশংসামূলক পোস্ট। সোমবার রাতের ৪৭টি পোস্টের গতি সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সোমবার রাতের পোস্টগুলোর মধ্যে ২৩টিই ছিল আগামী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জেতানোর জন্য তাঁর সমর্থনসূচক বার্তা। প্রতিটি প্রার্থীর জন্য আলাদা বার্তা থাকলেও, প্রায় সব পোস্টেই ভোটারদের ভোটকেন্দ্রের ঠিকানা খুঁজে নেওয়ার লিংক দেওয়া ছিল।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নরকে আক্রমণ
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর এবং নিজের কট্টর প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাভিন নিউসামকে তাঁর চিরচেনা খোঁচা দিয়ে “নিউস্কাম” (আবর্জনা) বলে ডাকেন ট্রাম্প। একই সাথে ওই পদের জন্য স্টিভ হিলটনকে সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প লেখেন, “মানুষ ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে পালাচ্ছে, অপরাধ বাড়ছে এবং এখানকার করের হার দেশের মধ্যে—হয়তো পুরো বিশ্বের মধ্যেই—সবচেয়ে বেশি। অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগে স্টিভ পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি তাকে সাহায্য করব! আমাদের প্রশাসন আর স্টিভ হিলটনের মতো একজন দারুণ গভর্নর একসাথে কাজ করলে ক্যালিফোর্নিয়া আগের চেয়েও উন্নত হবে।”
ইরান ও ইসরায়েল প্রসঙ্গে ভিন্ন সুর
ইরানের কথিত আত্মসমর্পণকে ‘ফেক নিউজ মিডিয়া’ কীভাবে বাঁকা চোখে দেখবে, তা নিয়ে নিজের একটি পুরোনো পোস্ট তিনি আবার শেয়ার করেন। ওই পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, মিডিয়া দেখাবে যেন “আমেরিকার ওপর ইরানের এক দুর্দান্ত ও গৌরবময় বিজয় হয়েছে।” গত মাস থেকে এ পর্যন্ত ট্রাম্প একই পোস্ট তিনবার শেয়ার করলেন। গত সপ্তাহে তাঁর মেডিকেল পরীক্ষার পরও তিনি এটি পোস্ট করেছিলেন।
তবে সোমবার দিনের শুরুর দিকে নেতানিয়াহুর সাথে ফোনালাপ নিয়ে দুটি পোস্ট করলেও, রাতের ঝড়ে তিনি আর সে বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। দিনের পোস্টে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইসরায়েলি নেতার সাথে আলোচনা “খুবই ফলপ্রসূ” হয়েছে এবং বৈরুতে কোনো সেনা পাঠানো হবে না। যে সেনারা রওনা হয়েছিল, তাদের “ইতিমধ্যেই ফেরত আনা হয়েছে” বলেও ট্রাম্প জানান।
তবে ট্রাম্পের এই দাবির সাথে নেতানিয়াহুর দেওয়া তথ্যের অমিল দেখা গেছে। নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, তিনি ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পকে বলেছেন, “হিজবুল্লাহ যদি আমাদের শহর ও নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ না করে, তবে ইসরায়েল বৈরুতে সন্ত্রাসী ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাবে।”
সোমবার রাতের এই পোস্টের বন্যায় ট্রাম্প দাবি করেন, গত মাসে সিবিএস চ্যানেল যে ‘দ্য লেট শো উইথ স্টিফেন কলবার্ট’ বন্ধ করে দিয়েছে, তার পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল।
ট্রাম্প দাবি করেন, গত দুই সপ্তাহে তিনি বহু “খারাপ রাজনৈতিক নেতা ও পন্ডিতকে” কুপোকাত করেছেন। তাঁর এই তালিকায় রয়েছেন লুইজিয়ানার সিনেটর বিল ক্যাসিডি, কেনটাকির কংগ্রেস সদস্য থমাস ম্যাসি, জর্জিয়ার ব্র্যাড র্যাফেনসপারগার এবং সিবিএস-এর “ভীষণ বোকা” স্টিফেন কলবার্ট।
নিজের রাজনৈতিক স্কোর এখন ‘৩৮-০’ উল্লেখ করে ট্রাম্প পরবর্তী টার্গেট হিসেবে আরও তিন লেট-নাইট টকশো হোস্টের দিকে আঙুল তোলেন। এর মধ্যে রয়েছেন বিল মার এবং তাঁর শো-র কৃত্রিম ‘হাসি তৈরির যন্ত্র’। ট্রাম্প লেখেন, “দেশের জন্য এত কঠোর পরিশ্রম করতে পারাটা আমার জন্য সম্মানের!”
কানাডাকে ‘৫১তম রাজ্য’ বানানোর ইঙ্গিত
পোস্টের মাঝে ট্রাম্প ওয়াশিংটন ডিসির সদ্য পুনর্নির্মিত ‘সিমন বলিভার মেমোরিয়াল’-এর একটি ছবি শেয়ার করেন। পাশাপাশি কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার পুরোনো প্রসঙ্গ টেনে একটি সংবাদের লিংক শেয়ার করে ক্যাপশনে লেখেন, “৫১তম রাজ্য!”
এছাড়াও, গত মে মাসে ভারতের নয়াদিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের ভিডিও শেয়ার করেন ট্রাম্প। তিনি নিজে সেখানে উপস্থিত না থাকলেও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে স্পিকারফোনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি নিজেদের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন।
মাঝরাতের বিবিধ পোস্ট
রাত ১০:৪৬ মিনিটে ট্রাম্প আবার ফিরে এসে আরও কিছু প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন, যা তিনি আগে ভুলে বাদ দিয়েছিলেন।
এরপর ৩০ মিনিটের একটি ছোট বিরতি নিয়ে, রাত ১১:১১ থেকে ১১:১৩ মিনিটের মধ্যে মাত্র দুই মিনিটে আরও চারটি পোস্ট করেন। এই পোস্টগুলোর বিষয়বস্তু ছিল বেশ এলোমেলো—যেমন হান্টার বাইডেনের ল্যাপটপ কেলেঙ্কারি, গ্রিন এনার্জি অনুদান, কাপড়ের উৎপাদন এবং গত সপ্তাহে তাঁর শারীরিক পরীক্ষা নিয়ে একটি ডানপন্থী পোর্টালের প্রশংসামূলক প্রতিবেদন, যেখানে দাবি করা হয়েছে ট্রাম্পকে তাঁর আসল বয়সের চেয়ে “১৪ বছর কম বয়সী দেখায়।”
মধ্যরাতের ঠিক আগে তিনি আরও তিনটি পোস্ট করেন। যার মধ্যে ছিল ডেমোক্রেটিক ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ফানি উইলিসের একটি মামলা, মার-এ-লাগোতে এফবিআই-এর অভিযানের পেছনে এক “মহাষড়যন্ত্রের” দাবি এবং কিউবাকে সাহায্যকারী ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার তদন্তের আহ্বান।
মঙ্গলবার ভোর ১২:০৮ মিনিটে তিনি তাঁর শেষ পোস্টটি করেন প্রাক্তন আইনজীবী মাইকেল কোহেনকে নিয়ে, যিনি ট্রাম্পের দেওয়ানি জালিয়াতি ও ফৌজদারি মামলায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।
শেষ পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, “আমি একজন নির্দোষ মানুষ, যার সাথে ভয়াবহ অন্যায় করা হয়েছে। আশা করি আদালত সেটাই করবে যা হওয়া উচিত বলে সবাই জানে।”
ট্রাম্পের এই গভীর রাতের উন্মাতাল পোস্টের বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করেছে ‘দ্য ডেইলি বিস্ট’।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন