প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে শুরু হওয়া সংঘাত, যা প্রায় ছয় মাস আগে শুরু হয়েছিল, কবে শেষ হবে এবং মার্কিন বাজারে তেলের দাম যুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমে একটি দীর্ঘ বক্তব্যের সময় ইরানের ওপর পুরো দায়ভার চাপিয়ে দেন।
ভ্যান্সের বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই ‘যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করা সম্ভব নয়, কারণ কিছু মাস আগে দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের ‘সক্রিয় সামরিক অভিযান’ বন্ধ হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উপকূলীয় এলাকা ও হরমুজ প্রণালিতে সপ্তাহজুড়ে তিন দিন ধরে চলা তুমুল গোলাগুলি সত্ত্বেও ভ্যান্স দাবি করেন, বর্তমানে কোনো সক্রিয় যুদ্ধ বা সরাসরি গুলিবিনিময় চলছে না। মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রাণঘাতী সংঘাতকে হালকা ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে, বিশেষ করে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী মাঠপর্যায়ে প্রতিনিয়ত ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার পেন্টাগন থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ১৯০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন এবং ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে একটি বিস্তৃত সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে তারা ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, রাডার ব্যবস্থা, নৌ সরঞ্জাম, মাইন স্থাপনার ক্ষমতা ও যোগাযোগ কেন্দ্রসহ প্রায় ৬০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। একই সময়ে, মার্কিন সামরিক পাহারা দিয়ে ওই প্রণালির মাধ্যমে বিভিন্ন জাহাজ পারাপার করা হয়। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান খুব দ্রুত তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করে ফেলায় তাদের কাছে আগ্রাসী হামলা চালানোর ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কর্মকর্তাদের মতে, এটি এখন অনেকটা আগাছা কাটার মতো হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবারের এই বিশাল অভিযান সফল হলেও মার্কিন কর্মকর্তারা জানেন যে, এই সংঘাতের দ্রুত সমাধান আপাতত সম্ভব নয়। মার্কিন নৌবাহিনীর কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি পরিবহনকারী বিশ্বখ্যাত সংস্থাগুলো এই প্রণালির মাধ্যমে তাদের জাহাজ পাঠাতে আতঙ্কিত ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করছে এবং কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইয়ে থাকা রিপাবলিকান নেতাদের চিন্তায় ফেলেছে।
এদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য তিনি কোনো রাজনৈতিক চাপ অনুভব করছেন না। তবে তার দলের মিত্র ও রাজনৈতিক উপদেষ্টারা স্বীকার করেছেন যে, নভেম্বরের ভোটের আগে সংঘাতের খবর গণমাধ্যম ও জনসম্মুখ থেকে যত দূরে থাকবে, দলের জন্য ততই মঙ্গল।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেছিলেন জেডি ভ্যান্স নিজেই। পরবর্তীতে এ বছরের শুরুতে এক কূটনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেন। তবে তার মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি মাত্র দুই সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে মরিয়া হয়ে উঠলে দুই পক্ষ ফের হামলা-পাল্টা হামলার পুরোনো বৃত্তে ফিরে যায়। আগস্ট মাসের অধিকাংশ সময় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও চলতি সপ্তাহে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইরান মাইন ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন অভিযোগে ফের মার্কিন বিমান হামলা শুরু হয়।
এই হামলায় হরমুজ প্রণালির কাছের একটি গ্রামে বিবাহানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অন্তত চারজন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর এসেছে। ভ্যান্স জানিয়েছেন, মার্কিন প্রশাসন এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করছে। বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে না দিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী লড়াইয়ের সময় কখনোই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না। "আমরা এমন কাজ কখনো করিনি এবং করবও না।" তবে তিনি স্বীকার করেন যে, অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা ঘটে যায়। এই নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বা চূড়ান্ত কোনো তথ্য এখনো তাদের হাতে আসেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সর্বসাম্প্রতিক হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরান।
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, এই মুহূর্তে তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের আলোচনা বা কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে না। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বার্তা খুব পরিষ্কার। তারা যতক্ষণ পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বা গুলি চালানো বন্ধ না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করছি না এবং ভবিষ্যতেও করব না।"
আলোচনার রাস্তা বন্ধ থাকায় এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ থামবে কি না—এমন প্রশ্নে ভ্যান্স বলেন, "এই যুদ্ধ কখন শেষ হবে জানতে চাওয়া আর ইরানিরা কখন জাহাজে গুলি চালানো বন্ধ করবে তা জানতে চাওয়া একই কথা। বাস্তব সত্য হলো, এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। এর জবাব জানতে হলে আপনাদের ইরানিদেরই জিজ্ঞাসা করতে হবে।" তিনি মার্কিন বাজারে তেলের দাম কবে আবার আগের মতো গ্যালনপ্রতি ৩ ডলারে নেমে আসবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হননি। তিনি কেবল বলেন, "আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা কেন এই লড়াই করছি। প্রথম ও প্রধান কারণ হলো, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে না পারে।"
হোয়াইট হাউসের মূল সংবাদ সম্মেলনকক্ষে ভ্যান্সের এই উপস্থিতি ছিল দীর্ঘ বিরতির পর। ৪২ দিন ধরে ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রেস ব্রিফিং রুমটি ব্যবহার করেনি। গত সপ্তাহে ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট পদত্যাগ করার পর এখনো সেখানে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে এসে ভ্যান্স প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কথা বলেন। ইরান সংঘাত থেকে শুরু করে নিজের হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া ও সুস্বাস্থ্যের বিষয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দেন তিনি। ভ্যান্স জানান, স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিষয়ক মন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের দেওয়া ডায়েট চার্ট মেনে চলাই তার শারীরিক পরিবর্তনের কারণ। তিনি উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার ও প্রচুর সোরক্রট খাচ্ছেন জানিয়ে রসিকতা করে বলেন, "খাওয়ার স্বাদ উপভোগ করতে চাইলে ভুলেও ববি কেনেডিকে ফোন দেবেন না।"
সংবাদ সম্মেলনে নিজের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের পক্ষে জোরালো সাফাই গান ভাইস প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি পেন্টাগনে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা, পদোন্নতি আটকে দেওয়া এবং ঢালাও পদত্যাগের ঘটনায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এমনকি ভ্যান্সের ইয়েল ল স্কুলের বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ সঙ্গী আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ড্রিসকল চলতি সপ্তাহে পদত্যাগ জমা দিয়েছেন, যা মার্কিন সেনাবাহিনীকে অভিভাবকহীন করে তুলেছে। সেনাবাহিনীর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হেগসেথ গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতৃত্বকে বরখাস্ত করেছেন।
রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ পর্যায়ের বিদায়ী অনেক আইনপ্রণেতাও হেগসেথের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তাকে অপসারণের দাবি তুলেছেন। নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিস মন্তব্য করেছেন, "দেশকে সেবা দেওয়া বীর সেনাসদস্য ও কর্মকর্তাদের এমন অপেশাদার ও অদক্ষ পরিচালনা তিনি ক্যারিয়ারে কখনো দেখেননি।" হেগসেথ সেনাকর্মকর্তাদের মেধা ও দক্ষতায় নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বোধ করেন বলেও তোপ দাগেন টিলিস। তবে এসব বিতর্ককে আমলে না নিয়ে ভ্যান্স দাবি করেন, হেগসেথ মূলত মার্কিন সামরিক ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক সংস্কার আনার লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন। ভ্যান্স তার ৪২ বছরের জীবনের কথা উল্লেখ করে বলেন, "আমার জীবদ্দশায় যুক্তরাষ্ট্র প্রচুর যুদ্ধ লড়েছে, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে আমরা তার একটিতেও বিজয়ী হতে পারিনি।
সূত্র: সিএনএন
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন