প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চীনের এক ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো (ব্রহ্মপুত্র) নদীর ওপর নির্মাণাধীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঠিক তলদেশে একটি সক্রিয় ভূগর্ভস্থ চ্যুতি বা ফল্ট লাইনের অস্তিত্ব রয়েছে।
ভূতাত্ত্বিকরা জানিয়েছেন, হিমালয় অঞ্চলের এই ফল্ট লাইনটি নির্মাণাধীন মেগা বাঁধের কাঠামোগত নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
হংকং ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে জানা গেছে, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে’-র তত্ত্বাবধানে মান্দারিন ভাষায় প্রকাশিত ‘সেডিমেন্টারি জিওলজি অ্যান্ড টেথিয়ান জিওলজি’ সাময়িকীতে এই গবেষণা পত্রটি গত মাসে প্রকাশিত হয়।
গবেষণা পরিচালনা করেছে চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন সেন্টার এবং মিডল ইয়ারলুং সাংপো রিভার ন্যাচারাল রিসোর্সেস অবজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ স্টেশনের চীনা ভূতাত্ত্বিকদের একটি যৌথ দল।
গবেষকরা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ‘পাইঝেন ফল্ট’ নামের এই ভূগর্ভস্থ ফাটলটি প্লাইস্টোসিন বা বরফ যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত সক্রিয়। এই আন্দোলনের কারণে এটি মেদগ কাউন্টির এই মেগা বাঁধ, সংযোগকারী সড়ক, সেতু, টানেল এবং সামগ্রিক কৃত্রিম জলাধারের কাঠামোর উপর বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ভূগর্ভস্থ প্লেটের দীর্ঘ সময় ধরে হওয়া নড়াচড়ার ফলে এই চ্যুতিটি আশেপাশের শিলাখণ্ডগুলোকে পুরোপুরি ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। এর ফলে মাটির ভেতরের স্তরের ধারণক্ষমতা ও দৃঢ়তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যার ফলে এই ভঙ্গুর ভিত্তিটি ৬০ হাজার মেগাওয়াটের একটি বড় বাঁধ এবং এর পেছনে জমা থাকা কোটি কোটি গ্যালন পানির ওজন ধারণ করতে গিয়ে যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে।
গবেষণা প্রতিনিধি দলটি সতর্ক করেছে যে, তিব্বতের পার্বত্য অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি আলগা এবং সেখানে মাটির কণার সংযোগ খুব দুর্বল। একবার যখন এই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জলাধারে পানি পূর্ণ হবে, তখন দীর্ঘস্থায়ী জলীয় সম্পৃক্ততা, ফল্ট লাইনের অবিরত কম্পন এবং ভূমিকম্পের সম্মিলিত প্রভাবে জলাধারের দুই পাশে পাহাড়ে প্রলয়ংকরী ভূমিধস ঘটবে।
এ ধরনের ধস সরাসরি বাঁধের মূল পরিকাঠামো ও সেখানে কর্মরত কর্মীদের জীবনকে খুব বিপন্ন করে তুলবে।
তিব্বতে গেল বছর থেকে এই মেগা বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে চীনের বিখ্যাত থ্রি গর্জেস বাঁধের চেয়ে তিন গুণ বড় এবং এর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ধরা হয়েছে ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা।
ইয়ারলুং সাংপো নদীটি তিব্বত ছেড়ে ভারতের অরুণাচল ও আসামের উপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে যমুনা নদী নামে প্রবেশ করেছে। এই কারণে ব্রহ্মপুত্রের ভাটিতে অবস্থিত ভারত ও বাংলাদেশ এই মেগা বাঁধটিকে ‘ভূতাত্ত্বিক টাইম বোমা’ হিসেবে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে।
চীনা বিজ্ঞানীদের এই গবেষণাটি উদ্বেগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা জানাচ্ছেন, বাঁধটি যেখানে নির্মিত হচ্ছে, সেই এলাকা মূলত হিমালয় সিসমিক বেল্ট বা ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে চীন ও তার আশপাশের অঞ্চলে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ঘন ঘন ভূমিকম্প ঘটে।
ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে অঞ্চলটিতে একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী ভূমিকম্পের বলয় তৈরি হয়েছে।
গবেষণায় কোয়াটারনারি যুগের (২৫.৮ লাখ বছর আগে থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিস্তৃত) টেকটোনিক নড়াচড়ার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই পাইঝেন চ্যুতিটি প্লাইস্টোসিন যুগের শুরুতে সৃষ্টি হলেও বর্তমানে হলোসিন যুগে এটি তার সক্রিয়তা বজায় রেখেছে।
এছাড়া প্রাচীন হ্রদের তলানির কার্বন ডেটিং পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মাত্র ৯ হাজার ৫০০ বছর আগে ফাটলটি সক্রিয় ছিল।
গবেষকেরা আধুনিক ভূকম্পনের সম্ভাবনা হিসেবে ২০১৭ সালে তিব্বতের মিলিনে সংঘটিত ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্পটির উল্লেখ করেছেন, যা ফল্ট লাইনের উত্তর প্রান্তে ঘটে ছিল।
তারা বলেন, ‘আঞ্চলিক ভূমিকম্পের প্রভাবে সহজেই ভূমিধস ও ধস ঘটতে পারে, যা প্রকৌশল স্থাপনা এবং কর্মীদের নিরাপত্তার পক্ষে হুমকি।’
তাহলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন, যে কোনো সময়ে এই অঞ্চলে মধ্যম বা বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে তা তাসের ঘরের মতো বাঁধটিকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে এবং এর ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম বন্যা ও ভূমিধস পুরো হিমালয় অঞ্চলসহ ভাটির বিস্তীর্ণ জনপদকে চাপা দিতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন