প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকাই চলচ্চিত্রে নায়ক মানেই যখন নির্দিষ্ট কিছু ছাঁচের মধ্যে আবদ্ধ ছিল, তখন অভিনয়, গান এবং স্টাইলিশ ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছিলেন জাফর ইকবাল। রুপালি পর্দায় তিনি কখনো রোমান্টিক নায়ক, কখনো দুর্দান্ত অ্যাকশন হিরো—বিভিন্ন রূপে দর্শকদের মন জয় করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীতেও তার বিচরণ ছিল সমান। ভক্তদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘বাংলার এলভিস প্রিসলি’ হিসেবে। আজ এই কিংবদন্তি অভিনেতা ও সংগীতশিল্পীর জন্মদিন।
১৯৫০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার পল্টনে জন্মগ্রহণ করেন জাফর ইকবাল। মাত্র ৪১ বছর বয়সে তার জীবন থেমে যায়। তবে এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই অভিনয় ও সংগীতে তিনি এমন কিছু স্মৃতি রেখে গেছেন, যা আজও দর্শক-শ্রোতার হৃদয়ে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
অভিনয়ের আগেই গানের জগতে
ছোটবেলা থেকেই জাফর ইকবালের সংগীতের সঙ্গে পরিচয় ছিল। তার বড় ভাই আনোয়ার পারভেজ ছিলেন খ্যাতিমান সংগীত পরিচালক এবং সুরকার। ছোট বোন শাহনাজ রহমতুল্লাহও দেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। সংগীতময় পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে গানের প্রতি আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছিল।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে, ১৯৬৬ সালে, বন্ধুদের নিয়ে একটি ব্যান্ড গড়ে তোলেন জাফর ইকবাল। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আগে সংগীতশিল্পী হিসেবে তার পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে রুপালি পর্দায় জনপ্রিয়তা পেলেও গানের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি।
১৯৬৯ সালে খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘আপন পর’ সিনেমার মাধ্যমে তার বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে। ছবিটিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন কবরী। এরপর ধীরে ধীরে অভিনয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেন জাফর ইকবাল। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও পরিচিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন প্রয়াত এই নায়ক।
‘মাস্তান’ থেকে ‘নয়নের আলো’
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি ‘মাস্তান’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে ড্যাশিং নায়ক হিসেবে পরিচিতি পান জাফর ইকবাল। পর্দায় তার উপস্থিতি, ব্যক্তিত্ব এবং অভিনয়ের ধরন দর্শকদের কাছে তাকে আলাদা করে তোলে। এরপর ‘নয়নের আলো’ তাকে প্রতিষ্ঠিত করে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে।
তবে জাফর ইকবালের তারকাখ্যাতির পেছনে শুধুমাত্র অভিনয় কিংবা জনপ্রিয় সিনেমা ছিল না। সমসাময়িক অনেক নায়কের তুলনায় তার পোশাক, চুলের ছাঁট এবং ব্যক্তিত্ব ছিল ব্যতিক্রম। পর্দায় তার শরীরী ভাষা এবং চরিত্র ফুটিয়ে তোলার নিজস্ব ধরনও তৈরি করেছিল আলাদা এক স্টাইল।
এ কারণে পরবর্তী সময়ে তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম স্টাইলিশ নায়ক ও ফ্যাশন আইকন হিসেবে স্মরণ করা হয়। তার সাজপোশাক ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব সে সময়ের তরুণদের মধ্যেও দেখা যেত।
কেন ‘বাংলার এলভিস প্রিসলি’?
জাফর ইকবালকে ভক্তরা ‘বাংলার এলভিস প্রিসলি’ নামেও ডাকতেন। পশ্চিমা সংগীতের কিংবদন্তি এলভিস প্রিসলির প্রতি তার অনুরাগ ছিল। সংগীতচর্চা, পোশাক এবং ব্যক্তিত্বে সেই প্রভাবের ছাপও পাওয়া যেত। সব মিলিয়ে এই উপাধি হয়ে ওঠে তার পরিচয়ের একটি অংশ।
অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সংগীতশিল্পী হিসেবেও তিনি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তার প্রথম সিনেমায় গাওয়া গান ছিল ‘পিচ ঢালা পথ’। তার কণ্ঠে গাওয়া ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’, ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী’ এবং ‘প্রেমের আগুনে’ গানগুলো শ্রোতাদের কাছে পরিচিত। আশির দশকে প্রকাশিত হয়েছিল তার একটি অডিও অ্যালবামও।
দেড় শতাধিক সিনেমায় অভিনয়
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য সিনেমায় কাজ করেছেন জাফর ইকবাল। তার অভিনীত ছবির সংখ্যা প্রায় ১৫০। উল্লেখযোগ্য সিনেমার তালিকায় রয়েছে ‘সূর্য সংগ্রাম’, ‘মাস্তান’, ‘নয়নের আলো’, ‘অবুঝ হৃদয়’, ‘ভাই বন্ধু’, ‘অবদান’, ‘প্রেমিক’, ‘আশীর্বাদ’, ‘প্রতিরোধ’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘মেঘ বিজলী বাদল’, ‘সন্ধি’ এবং ‘বন্ধু আমার’সহ আরও অনেক ছবি। ববিতার সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি সবচেয়ে বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তাদেরকে একসঙ্গে প্রায় ৩০টি ছবিতে দেখা গেছে।
বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। কখনো রোমান্টিক আবহে, কখনো অ্যাকশন দৃশ্যে—পর্দায় তার উপস্থিতি দর্শকদের কাছে ছিল আকর্ষণীয়। অভিনয় ও সংগীতের এই যুগল পরিচয়ই তাকে সমসাময়িক তারকাদের থেকে আলাদা করেছিল।
৪১ বছরেই থেমে যায় পথচলা
জাফর ইকবালের জীবনের শেষ অধ্যায় এসেছিল বড় অসময়ে। নিয়ন্ত্রণহীন জীবনযাপনের কারণে একসময় ক্যান্সারে আক্রান্ত হন তিনি। দেখা দেয় হার্টের সমস্যা। দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে যায়। শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগে ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি মাত্র ৪১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ছিল ‘লক্ষ্মীর সংসার’।
জীবন খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি, কিন্তু শিল্পী হিসেবে তার অর্জন ছিল বহুমাত্রিক। সময়ের ব্যবধানে ঢাকাই চলচ্চিত্রের অনেক কিছু বদলে গেলেও দর্শকের স্মৃতিতে তিনি আজও সেই স্টাইলিশ নায়ক, যার উপস্থিতি ছিল একেবারেই নিজস্ব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন