প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রংপুরের মিঠাপুকুরে একটি মাদরাসার নামে রেকর্ড হওয়া ৪২ শতক সরকারি জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। সেই সঙ্গে সেখানে থাকা শতাধিক মূল্যবান গাছ কাটা নেওয়ার অভিযোগও একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।
সরকারি সম্পদ রক্ষা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, গাছ কাটা বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে রংপুর জেলা প্রশাসক ও মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লেখা ২৩ জুন এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকালে সরেজমিন উপজেলা বড় হযরতপুর ইউনিয়নের সদুরপাড়া গ্রামে গেলে স্থানীয়রা এসব কথা বলেন। তারা অভিযোগ করেন যে বেশ কয়েকটি গাছ কাটা হয়েছে। ড। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সদুরপাড়া গ্রামে অহেতন নেছা ইবতেদায়ী মাদরাসার নামে প্রায় ৪২ শতক জমি রেকর্ডভুক্ত।
দীর্ঘকাল ধরে ওই জমিতে ইউক্যালিপটাস, শালসহ বিভিন্ন প্রজাতির শতাধিক গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব গাছের বর্তমান বাজারমূল্য ১০ লাখ টাকারও বেশি। তাদের মতে, জমিটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সম্পদও। তাদের দাবি, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে জমিটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং এখনো সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শাজাহান, সাজু, সাইদুলসহ কয়েকজন ব্যক্তি জমিটি নিজেদের দাবি করে দীর্ঘদিন ধরে দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। ইতোমধ্যে কিছু মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। অবশিষ্ট গাছগুলোও কাটার প্রস্তুতি চলছে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে শাজাহান মিয়া বলেন, ‘আমার মা মাদরাসার নামে জমিটি দান করেছেন। জমির রেকর্ড মাদ্রাসার নামে হয়েছে। তবে গাছের মালিকানা নিয়ে আমাদের দাবি রয়েছে।’
আর স্থানীয়রা বলছেন, জমি এবং গাছ উভয়ই সরকারি সম্পদের অংশ।
এলাকাবাসী জানায়, বহু বছর আগে ওই জমিতে অহেতন নেছা ইবতেদায়ী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। নানা কারণে মাদরাসাটি স্থানান্তরিত হলেও জমিটি এখনো মাদরাসার নামেই রেকর্ডভুক্ত। তাই জমিটির মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি তাদের।
অভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের সুবিধার কথা বিবেচনা করে সেখানে একটি ওয়াক্তের নামাজঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এর পাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য রংপুর জেলা পরিষদ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের বাধার কারণে সেই প্রাচীর নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সরকারি জমির একাংশে অবৈধভাবে দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। এসব দোকানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সেখানে মাদক সেবনসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে।
এছাড়া যথাযথ প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই সরকারি জমির একটি অংশে লাশ দাফন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বসতবাড়ির পাশে এসব কর্মকাণ্ড চলায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মতিয়ার রহমান বলেন, জমিটি সরকারি রেকর্ডে মাদরাসার নামে রয়েছে। এখানে অনেক কষ্ট করে গাছ লাগানো হয়েছে। বেশ কিছু গাছ ইতিমধ্যে কাটা গেছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে সরকারি সম্পদ রক্ষা করুক এবং দখলচেষ্টার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
গ্রামের ব্যবসায়ী একরামুল হক মণ্ডল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র জমিটি দখলের চেষ্টা করছে। তারা এখন গাছও কেটে নিতে চাইছে। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সরকারি সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে। আমরা চাই জমিটি দখলমুক্ত করে জনগণের স্বার্থে সংরক্ষণ করা হোক।’
মাদরাসার শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘এই জমি মাদরাসার নামে রেকর্ডভুক্ত। এটি দখলমুক্ত করে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা-সহায়ক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহার করা যাবে। সরকারি সম্পদ রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।’
এর আগে প্রভাবশালীরা একটি ইউক্যালিপটাস গাছ চার হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। তবে আর কয়েকটি গাছ কয়েক বছরে গাছ বিক্রি করা হচ্ছে।
অন্য শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘সরকারি সম্পদ দখল কিংবা গাছ কাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করলে সত্য বেরিয়ে আসবে। আমরা চাই আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
আবেদনে এলাকাবাসী সাত দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- জমির মালিকানা ও রেকর্ড যাচাই করে জরুরি তদন্ত, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা অপসারণ, অনুমোদনবিহীন দাফনের বিষয়ে তদন্ত, সরকারি গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং জমিটি মাদরাসার নামে সংরক্ষিত করে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও শিক্ষা-সহায়ক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার নিশ্চিত করা।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘লিখিত অভিযোগটি আমাদের নথিভুক্ত হয়ে থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। সরকারি জমি, সরকারি গাছ কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ কেউ অবৈধভাবে দখল বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন