প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে একটি অসাধারণ রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করেছেন। প্রথম রাউন্ডে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল-সমর্থিত ডানপন্থি প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে লুলার ৪৫ শতাংশের বিপরীতে এগিয়ে ছিলেন। এই ফলাফল তার সমর্থকদের মধ্যে পরাজয়ের শঙ্কা তৈরি করে। তবে দ্বিতীয় রাউন্ডে লুলা ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে চমকপ্রদ জয় লাভ করেন, যেখানে ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পান।
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে লুলার এই জয় নির্বাচনের পূর্ববর্তী সব জনমত জরিপকে ভুল প্রমাণিত করে রাজনীতিতে তার নাটকীয় পুনরুত্থান ঘটিয়েছে, যা খুব কম মানুষই আশা করেছিলেন। লুলার এই জয় কেবল কট্টর ডানপন্থিদের ক্ষমতায় ফিরে আসাকে থামায়নি, বরং পুরো অঞ্চলে ডানপন্থিদের ধারাবাহিক নির্বাচনি জয়ের ধারাকেও ভেঙে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপমূলক এজেন্ডার ওপরও বড় আঘাত হেনেছে।
প্রথম রাউন্ডে বলসোনারো অপ্রত্যাশিতভাবে লুলাকে পরাজিত করার পর সেই ফলাফল ব্রাজিলসহ পুরো অঞ্চলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। লুলার সরকারের শক্তিশালী আর্থ-সামাজিক সাফল্যের প্রেক্ষাপটে এই পরাজয় ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডের ভোটের আগের তিন সপ্তাহে এক অসাধারণ রাজনৈতিক গণসংহতি গড়ে ওঠে, যা লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির ধীরগতির নির্বাচনি প্রচারণাকে ব্রাজিলের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রূপান্তরিত করে।
লুলার সরকারের গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নির্বাচনে তাদের পরাজয়ের আশঙ্কা ছিল না। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ব্রাজিলের অর্থনীতি মোট ৯ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে, যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বেকারত্বের হার ২০২২ সালের ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে, যা দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এছাড়া জাইর বলসোনারোর শাসনামলে ব্রাজিল জাতিসংঘের ‘ক্ষুধা মানচিত্রে’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, কিন্তু লুলার আমলে দেশটি সেই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। আমাজন অঞ্চলে বন উজাড়ের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা তার পূর্বসূরির আমলের ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত।
তবে লুলার শাসনামলে সবকিছুই যে খুব ভালো ছিল, তা নয়। লাখ লাখ ব্রাজিলীয় ক্রেডিট কার্ডের ঋণের জালে আটকে পড়ে উচ্চ সুদের হারের সঙ্গে লড়াই করছেন। অনলাইন জুয়ার ব্যাপক বিস্তার অনেক পরিবারের জীবনযাত্রাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের ফল এসব নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, সমাজে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এর জবাবে লুলা সাহসী কিছু পদক্ষেপ নেন, যার মধ্যে ছিল ঋণ মওকুফের ব্যাপক উদ্যোগ, অনলাইন বাজি ধরার ওপর বিধিনিষেধ, সামাজিক সুবিধার পরিধি বৃদ্ধি, জ্বালানি ভর্তুকি প্রদান এবং কর্মসপ্তাহ ছয় দিন থেকে কমিয়ে পাঁচ দিন করা। এই নীতিগুলোর লক্ষ্য ছিল সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অর্জনগুলোর সঙ্গে ভোটারদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক উদ্বেগের যোগসূত্র পুনঃস্থাপন করা।
অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো ভিন্ন এক রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন, যার মধ্যে সরকারি ব্যয় ব্যাপক কমানো, বেসরকারীকরণ, কর হ্রাস এবং অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি ছিল। তার প্রস্তাবের মধ্যে আরো ছিল এল সালভাদরের কুখ্যাত কারাগার ব্যবস্থার আদলে পাঁচটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কারাগার নির্মাণ এবং ভারী অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া।
ফ্লাভিওর বাবা জাইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের দায়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। ফ্লাভিও তাকে ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এছাড়া ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার ঘটনায় দণ্ডিত ব্যক্তিদেরও তিনি ক্ষমা করার অঙ্গীকার করেন। তার সমর্থকদের কাছে এটি ছিল বিচারিক নিপীড়ন হিসেবে গণ্য হওয়া বিষয়গুলোকে উল্টে দেওয়ার একটি সুযোগ। অন্যদিকে বিরোধীদের মতে, এটি ছিল ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকে বৈধতা দেওয়ার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করার হুমকি।
দ্বিতীয় রাউন্ডে তরুণ ভোটাররা তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত হতে শুরু করলে লুলার নির্বাচনি প্রচারণায় নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চারিত হয়। এই প্রচারণা বলসোনারোর পক্ষে কাজ করা মেটা তথা ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টদের প্রচারণাকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন কেবল ব্রাজিলের গণতন্ত্র নয়, বরং দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়। কেননা লুলার পুরো মেয়াদজুড়ে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে, দেশটির ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছে, জাইর বলসোনারোর বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রকাশ্যে ফ্লাভিওর প্রার্থিতাকে সমর্থন জানিয়েছে।
মে মাসে ট্রাম্প ওভাল অফিসে ফ্লাভিও বলসোনারোকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এর দুদিন পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্রাজিলের দুটি বৃহত্তম অপরাধী সংগঠনকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন এবং এই পদক্ষেপটির জন্য ফ্লাভিও প্রকাশ্যেই অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এসব কর্মকাণ্ড ব্রাজিলের নির্বাচনি রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে আরো সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে এবং ওয়াশিংটনের তথাকথিত ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদ’ বিরোধী সম্প্রসারণশীল যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেশটিতে মার্কিন সামরিক অভিযানের পথও প্রশস্ত করতে পারে। বিশ্ব দেখেছে, কীভাবে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ করে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে এনে কারাগারে আটকে রেখেছে।
ট্রাম্প যখন লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলকে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান সামরিক আধিপত্যের বলয়ে টেনে আনতে চাইছেন, লুলা তখন তা প্রতিরোধ করতে তার দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, সংগঠিত অপরাধ দমনে যেকোনো সহযোগিতার ক্ষেত্রে অবশ্যই জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাতে হবে। লুলা নির্বাচনকে জনগণের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাছাই হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যেখানে একদিকে ছিল নিজস্ব পথে চলা একটি সার্বভৌম ব্রাজিল, অন্যদিকে ছিল ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক এজেন্ডার কাছে নতিস্বীকার করা ব্রাজিল। রোববারের নির্বাচনের ফল প্রমাণ করে, জনগণ সার্বভৌম ব্রাজিলের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লুলার এই জয় লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের ফিরে আসার পর থেকে হন্ডুরাস, চিলি, বলিভিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে ডানপন্থি শক্তি নির্বাচনে একের পর এক জয় পেয়েছে। তবে লুলার পুনর্নির্বাচন ইঙ্গিত দেয়, ডানপন্থি সেই জোয়ার এখন স্তিমিত হয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে ব্রাজিলের নির্বাচনের এই ফল লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের নেতৃত্বের শক্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই নিয়মিত লুলার সমালোচনা করেন এবং ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে জনমত জরিপে মিলেই ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন। চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তের জনপ্রিয়তায়ও ধস নেমেছে।
অন্যদিকে লুলার বিজয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাম। লুলা পরাজিত হলে শেইনবাম লাতিন আমেরিকায় আরো বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেন। কেননা এই অঞ্চলের অনেক দেশই মেক্সিকোর উত্তরের প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর বিপরীতে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে জনবহুল এবং বৃহত্তম অর্থনীতির দুটি দেশ ব্রাজিল ও মেক্সিকো অদূর ভবিষ্যতেও বামপন্থি আদর্শের পথেই যে অটল থাকবে, তা লুলার বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত করে দিয়েছে।
তবে লুলার বিজয়ে লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থি প্রবণতা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমনটা বলার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু তারপরও এ কথা বলা যায়, লুলার বিজয় লাতিন আমেরিকায় উগ্র ডানপন্থি ঢেউকে থামিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তাদের আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ মসৃণ হবে না। যদিও ট্রাম্পের হুমকি এখনো রয়ে গেছে, তবে তার প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়টি হয়তো এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে।
লুলার বিজয়ের তাৎপর্য ব্রাজিলের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিজয় গণতন্ত্র, বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক আইন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের সার্বভৌমত্বের প্রবক্তাদের কাছে কট্টর ডানপন্থিদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
আলজাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন