প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চকচকে সাজসজ্জার আড়ালে বিষের ব্যবসার খবর উঠে এসেছে।
আরএফসির খাবার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৫ জন, অভিযানে গোপন কক্ষ ও পচা খাবার উদ্ধার হয়েছে।
বাইরে ঝকঝকে সাজসজ্জা, আধুনিক ডেকোরেশন সঙ্গে মুখরোচক খাবারের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। কিন্তু সেই চাকচিক্যের আড়ালে আসল চিত্র কী?
মাদারীপুর শহরের জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট ‘আরএফসি’র খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়েছেন নারী ও শিশু সহ অন্তত ৩৫ জন। এ ঘটনার পর প্রশাসনের অভিযান চলাকালীন একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
রেস্টুরেন্টটিতে পাওয়া গেছে পচা-বাসি খাবার, ক্ষতিকর রং, নিম্নমানের তেল, অস্বাস্থ্যকর রান্নাঘর এবং একাধিক রহস্যজনক গোপন কক্ষ।
জানা গেছে, শহরের পুরানবাজার এলাকার আরএফসি রেস্টুরেন্টে গ্রিল ও নানরুটি খাওয়ার পর একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন বহু গ্রাহক। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত বমি, ডায়রিয়া ও তীব্র পেটব্যথা নিয়ে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ভর্তি হন অন্তত ৩৫ জন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থার গুরুতর হয়ে যাওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, একই রেস্টুরেন্টের খাবার খাওয়ার পর তাদের পরিবারের একাধিক সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই ঘটনার ফলে জেলাজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাবের তত্ত্বাবধানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসকের ভ্রাম্যমাণ আদালতের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আল মঈন সিকদার।
অভিযানকালে রেস্টুরেন্টটির রান্নাঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, একই ফ্রিজে কাঁচা মাংস ও রান্না করা খাবার সংরক্ষণ, বাসি ও পচা খাদ্য সামগ্রী এবং খাবারে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নন-ফুড গ্রেড রং ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া নিম্নমানের তেল ব্যবহারের অভিযোগও উঠে এসেছে। নিরাপদ খাদ্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আল মঈন সিকদার বলেন, “অভিযানে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে। কাঁচা ও রান্না করা খাবার একই স্থানে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। খাবারে ক্ষতিকর রং এবং নিম্নমানের তেল ব্যবহারের বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছে। এসব অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয়েছে।”
তবে অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো রেস্টুরেন্টের ভেতরে একাধিক ছোট ছোট গোপন কক্ষের সন্ধান পাওয়া। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছে, রেস্টুরেন্টে এ ধরনের গোপন কক্ষ রাখার কোনো বিধান নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন যাবত এসব কক্ষকে কেন্দ্র করে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছিল।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গোপন কক্ষগুলো অপসারণ না করলে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেওয়া হবে।
অভিযানের পুরো সময় রেস্টুরেন্টটির মালিক রাহাত ব্যাপারীকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি। প্রশাসনের সঙ্গে তিনি কোনো যোগাযোগও করেননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় ঘটনার পরও মূল দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
এ প্রসঙ্গে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আল মঈন সিকদার বলেন, “খাদ্য বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ভুক্তভোগীরা আইনগতভাবে অভিযোগ বা মামলা দায়ের করলে তদন্ত সাপেক্ষে আরএফসি রেস্টুরেন্টের মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু জরিমানা নয়, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত গুরুতর অনিয়মের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, চকচকে পরিবেশ ও আকর্ষণীয় প্রচারণার আড়ালে নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করা হলে, তা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু ও তরুণদের মধ্যে ফাস্টফুড ও গ্রিলজাতীয় খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়লেও খাবারের গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। মাদারীপুরের এ ঘটনাটি সেই আশঙ্কাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন