প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দৃশ্যটি এমন একটি অনুভূতির চিত্র, যা মনে হয় কল্পনার কাহিনী থেকে এক্ষুনি বাস্তবে উঠে এসেছে। ভেন্যুও ছিল লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম, যেখানে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব-ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। ম্যাচের ঘড়ির চলছিল ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তের খেলা, স্কোরবোর্ডে তখন ০-০ ড্র ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দক্ষিণ আফ্রিকার ডি-বক্সের ঠিক বাইরে বল পান কানাডার স্টিফেন ইউস্তাকিও। চোখের পলকে বাজপাখির মতো ডাইভ দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকান গোলকিপার রনওয়েন উইলিয়ামসকে পরাস্ত করে তিনি বলটিকে জালে পাঠান। আর এই এক গোলের মাধ্যমে কানাডা ইতিহাস গড়ে, প্রথমবার বিশ্বকাপের শেষ ১৬ বা নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়।
এই রুদ্ধশ্বাস জয় দিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসে ইউস্তাকিও প্রথম নকআউট ম্যাচের এক অসাধারণ সমাপ্তি হাজির করেন। ২৯ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারে এটি সম্ভবত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দামি ও স্মরণীয় গোল।
বিশ্বকাপের মঞ্চে কানাডাকে ইতিহাস উপহার দেওয়া এই মহানায়ককে ফুটবলে একজন খেলোয়াড় বললে ভুল হবে। স্টিফেন ইউস্তাকিও একজন জীবনের চরম ট্র্যাজেডিকে জয় করা লড়াকু সৈনিক। ২০২৬ বিশ্বকাপের লস অ্যাঞ্জেলেসের ঐ রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে গোল করার সময়, তাঁর হৃদয়ে বাবা-মাকে হারানোর একটি গভীর বেদনা লুকিয়ে ছিল। ২০২৩ সালে পোর্তোর ম্যাচ চলাকালীন তাঁর মায়ের মৃত্যু এবং ঠিক এক বছর পরে বাবার আকস্মিকভাবে চলে যাওয়া, এই দুটো বড় আঘাত তিনি বুক চেপে সহ্য করেছেন। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি, বরং সেই গভীর শোককে নিজের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করেছেন।
পিঠাপিঠি বাবা-মায়ের মৃত্যু ও জীবনের ট্র্যাজেডি সম্পর্কে: ২০২৩ সালের এপ্রিলে সান্তা ক্লারার বিপক্ষে পোর্তোর এক হোম ম্যাচ চলাকালীন ইউস্তাকিওর মা এসমেরালদা ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর এক বছরের মাথায়, হঠাৎই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান তার বাবা। তবে এই শোকের কিছুদিন আগেই ইউস্তাকিও এবং তাঁর প্রেমিকা কনস্টান্টার কোল একটি কন্যাসন্তান, বেনেদিতাকে স্বাগত জানান।
লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে ম্যাচশেষের আবেগঘন সাক্ষাৎকারে ইউস্তাকিও বলেন, 'আমি যা কিছু করি, সবকিছু আমার পরিবারের জন্য; আমার বাবা-মা, আমার প্রেমিকা, আমার মেয়ে, আমার ভাই এবং দেশের বন্ধুদের জন্য-এই সবার জন্য।'
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে 'স্পোর্টস নেট কানাডা'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউস্তাকিওর বড় ভাই ও ইন্টার টরন্টো এফসির প্রধান কোচ মাউরো ইউস্তাকিও বলেন, তাঁরা দুই ভাই এই গভীর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার এবং বাবা-মায়ের জীবনকে সম্মান দেখানোর জন্য সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মাউরো আবেগের সঙ্গে বলেন, 'আমাদের বাবা-মা... তারা আমাদের ডানা দিয়েছিলেন। তাই এখন উড্ডয়নের দায়িত্বটা আমাদের নিজেদেরই।'
সাবেক ফুটবলার থেকে কোচে রূপান্তর করা মাউরো সেই সাক্ষাৎকারে আরও জানান, ওন্টারিওর লিমিংটনে একটি বৃহৎ পর্তুগিজ কমিউনিটি ছিল, যেখানে সব পরিবার এক সঙ্গে জড়ো হতো এবং তাঁর ও স্টিফেনের মতো শিশু-কিশোররা নিয়মিত ফুটবল খেলত। আন্তর্জাতিক ফুটবলের বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কানাডার হয়ে নিজের যাত্রা শুরু করে ইউস্তাকিও, খেলেছিলেন ২০১২ সালের 'এজিএস কাপ'-এ। কিছুদিন পর, পর্তুগালের হয়ে অনূর্ধ্ব-২১ দলে কিছু ম্যাচ খেলেন, খেলেছেন ২০১৯ ইউয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাই পর্বেও।
কিন্তু ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পাকাপাকিভাবে কানাডার সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। একই বছরের অক্টোবরে কনকাকাফ নেশনস লিগের ম্যাচে জাতীয় দলে ডাক পান। ২০২১ সালের কনকাকাফ গোল্ড কাপে প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন এই মিডফিল্ডার। এরপর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ, ২০২৩ সালের কনকাকাফ নেশনস লিগের ফাইনাল এবং পোর্তোর হয়ে ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও মাঠে নামেন।
রবিবারের ম্যাচে নিয়মিত অধিনায়ক আলফোনসো ডেভিস ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন, তাই দলের অন্তর্বর্তীকালীন অধিনায়কের দায়িত্ব ইউস্তাকিওর উপর ছিল। ম্যাচ শেষে তিনি মন্তব্য করেন, 'এই জয়টা পাওয়ার জন্য আমরা জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছি। আমরা আসলেই এই ঐতিহাসিক জয়টা সব কানাডিয়ানের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে চাই।'
দলের লড়াকু মানসিকতা নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন, 'আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস হারাইনি এবং পুশ করে গেছি। আমরা তো এর চেয়ে ভালো অন্য কোনো সমাপ্তির কথা ভাবতেই পারতাম না।'
সহ-আয়োজক কানাডার হয়ে তাঁর ৬১তম ম্যাচে এসে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ গোলটি করেছেন ইউস্তাকিও। সেই ঐতিহাসিক জয়সূচক গোলটি সম্পর্কে তিনি বলেন, 'গোলটি সত্যিই অসাধারণ ছিল। কিন্তু সত্যি বলতে, যখন আমি শটটি নিচ্ছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল পুরো দেশবাসী আমার সঙ্গে শটটি নিয়েছে। যেন সবাই সেই শটটিকে অল্প অল্প করে শক্তি জুগিয়েছে, আর বলটি জালে আছড়ে পড়েছে।'
শেষ ৩২-এর রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিদায় করে কানাডা এবার শেষ ষোলোর প্রতিপক্ষের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামীকাল নেদারল্যান্ডস বনাম মরক্কো ম্যাচের জয়ী দলের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটার জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে তারা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন