প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একটি রাজনৈতিক দলের বিরোধী অবস্থানে থাকা কালীন যদি তারা একজন মৃত মানুষের মর্যাদা, তার দাফনের অধিকার এবং তার পরিবারের ন্যায্য দাবির প্রতি সম্মান প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই দল রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার কতটুকু সুরক্ষিত থাকবে—এটি কি প্রশ্ন তোলা অন্যায়? বরং এটি বাংলাদেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের বিবেকের প্রশ্ন।
রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতা দখল নয়; বরং রাজনীতি মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়। যে রাজনৈতিক দল বিরোধী দলে থেকেও মানুষের প্রতি সহনশীলতা, উদারতা ও ন্যায়বিচারের পরিচয় দিতে পারে না, সেই দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে কেমন আচরণ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাছে আমাদের স্পষ্ট প্রশ্ন—মানবিক অধিকার কি শুধুমাত্র নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের জন্য, নাকি প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য?
সম্প্রতি একজন মৃত ব্যক্তির দাফন ও কবর দেওয়া নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়, অতীত কর্মকাণ্ড কিংবা মতাদর্শ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী তদন্ত হতে পারে, বিচার হতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর পর তার মরদেহের প্রতি সম্মান, পরিবারের ধর্মীয় ও মানবিক অধিকার এবং আইনসম্মতভাবে দাফনের বিষয়টি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়।
আমরা কোনো ব্যক্তির অতীত কর্মকাণ্ডকে আড়াল করতে চাই না। কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তার যথাযথ বিচার হওয়া জরুরি। তবে বিচার এবং প্রতিহিংসা এক বিষয় নয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মানবিকতা বিসর্জন দেওয়া যায় না। একজন মানুষকে রাজনৈতিকভাবে অপছন্দ করা এবং তার মরদেহের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
জামায়াতে ইসলামীর কাছে প্রশ্ন, যদি আপনারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মৃত্যুর পরও মানবিকতার প্রশ্নে সংযম দেখাতে না পারেন, তাহলে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে ভিন্নমতের জীবিত মানুষের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করবেন? তখন কি নাগরিকদের প্রতিটি মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য রাস্তায় নামতে হবে? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য কি মানুষকে প্রতিনিয়ত আন্দোলন করতে হবে?
অতীতে শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, বিচার ও দণ্ড কার্যকরের ঘটনাগুলো নিয়ে জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলেছে। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, এসব বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। সেই সময়ের বিচারব্যবস্থা, সাক্ষ্য এবং রাজনৈতিক চাপ নিয়ে যেসব বিতর্ক রয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হওয়া উচিত। তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির স্বীকারোক্তি, সাক্ষ্য কিংবা ভূমিকা সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণও উপস্থাপন করতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে সত্য প্রতিষ্ঠা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগকে সাধারণ ক্ষমা করার বিষয়ে জামায়াতের আমিরের বক্তব্য বা অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের আমিরের বক্তব্য নিজে থেকে রাষ্ট্রের আইনি ক্ষমা বা সাধারণ ক্ষমা হয়ে যায় না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে। অতএব, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির কিংবা অন্য যে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার হবে, আর কেউ নির্দোষ হলে তার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে বিচারের বাইরে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়।
আমরা বিশ্বাস করি, যে ধর্মের মানুষই হোন, যে বর্ণ বা জাতিগোষ্ঠীর সদস্যই হোন, যে রাজনৈতিক মতাদর্শেই বিশ্বাস করুন—প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে মৌলিক অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। এই অধিকার কোনো রাজনৈতিক দল দয়া করে দেয় না; এটি মানুষের স্বীকৃত অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব তা রক্ষা করা।
আমরা আমাদের ব্যক্তিগত শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ করতে চাই। কারণ ইনসাফের প্রশ্নে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কোনো স্থান নেই। যে মানুষটি আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, তারও ন্যায্য অধিকার রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন কথা বলবে, আদালত সিদ্ধান্ত দেবে। কোনো দল বা গোষ্ঠী নিজেরাই বিচারক, জল্লাদ ও অধিকার নির্ধারণকারী হয়ে উঠতে পারে না।
জামায়াতে ইসলামী যদি সত্যিই ইসলামের ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও ইনসাফের আদর্শে বিশ্বাস করে, তাহলে সেই আদর্শের প্রতিফলন তাদের আচরণেও দেখতে চাই। শুধুমাত্র বক্তৃতায় ন্যায়বিচারের কথা বললে হবে না; রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করতে হবে। মানবিকতা যদি কেবল নিজের দলের মানুষের জন্য হয়, আর প্রতিপক্ষের জন্য থাকে ঘৃণা ও প্রতিশোধ, তাহলে সেই মানবিকতার দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হবেই।
একজন মানুষ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনৈতিক অবস্থান, কর্মকাণ্ড এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করার অধিকার রাখেন। কিন্তু যারা এসব বিষয়ে সমালোচনা করেন, তাদের ভুলত্রুটি তুলে ধরার পরিবর্তে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি করা, এমনকি ফোন করে গালিগালাজ করাসহ বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর আচরণ তাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্পষ্টভাবে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তারা নিজেদের কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনা সহ্য করতে চান না। এ ধরনের আচরণ প্রমাণিত হলে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার পরিপন্থী। সমালোচনার জবাব গালিগালাজ বা হয়রানির মাধ্যমে নয়, যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে দেওয়া উচিত।
পরিশেষে বলতে চাই, মৃত মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে না পারা কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য গর্বের বিষয় নয়; আর জীবিত মানুষের অধিকার সংকুচিত করার আশঙ্কা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিচয় হতে পারে না। ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই যদি কোনো রাজনৈতিক দলের আচরণ নিয়ে নাগরিকদের মনে অধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে সেই দলকে নিজেদের অবস্থান ও আচরণ দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।
বাংলাদেশ কোনো একক রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এ দেশ সব নাগরিকের। এখানে ভিন্নমত থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, মতাদর্শের সংঘাত থাকবে—কিন্তু কোনো অবস্থাতেই মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও মৌলিক অধিকারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কাছে জিম্মি করা যাবে না।
আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার— ক্ষমতা নয়, ইনসাফই হোক রাজনীতির মানদণ্ড। প্রতিপক্ষের প্রতি আচরণ দিয়েই প্রমাণ হোক একটি দলের প্রকৃত চরিত্র। আর যে দল মানুষের অধিকার রক্ষার দাবি করে, তাদের আগে প্রমাণ করতে হবে—তারা বিরোধী মতের মানুষের অধিকারও সমানভাবে সম্মান করতে প্রস্তুত।
লেখক: কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, আমজনতার দল।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন