প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সাংহাইয়ের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝে কিছু স্থান সকাল শুরু করে ভিন্নভাবে। সেখানে দিনের হিসাব অফিস, যানজট কিংবা বাজার দিয়ে নয়, বরং হিসাব হয় অনুশীলনের সময় দিয়ে। ছোট বয়সের ছেলেমেয়েরা আসে প্রশিক্ষণে। কারো হাতে ব্যাট, কারো পায়ে দৌড়ের জুতা, কেউ বা পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য তখন অলিম্পিক নয়, কিন্তু এই বয়সেই শুরু হয় সেই দীর্ঘ পথের প্রথম ধাপ।
চীনের খেলোয়াড় তৈরির গল্পটি বোঝার জন্য সাংহাইয়ের শুহুই অঞ্চলের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। শুহুই জেলা যুব ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও যুব ক্রীড়া বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫৭ সালে। কয়েক দশকের পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চীনের ক্রীড়া প্রতিভা তৈরির ব্যবস্থার একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠেছে। ২০০৪ সাল থেকে টানা চার মেয়াদে এটি জাতীয় পর্যায়ের উচ্চমানের ক্রীড়া প্রতিভার ঘাঁটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এখান থেকে জাতীয় পর্যায়েও খেলোয়াড় উঠে এসেছে।
চীনের ক্রীড়া সাফল্য বোঝার জন্য একটি ক্রীড়া বিদ্যালয়ের গল্পই যথেষ্ট নয়। বরং শুহুই দেখায়, কীভাবে স্কুল, ক্রীড়া বিদ্যালয়, কোচ, স্থানীয় প্রশাসন, প্রতিযোগিতা ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ—সবকিছুকে একই ধারায় আনার চেষ্টা করা হয়।
প্রথমে খোঁজা হয় প্রতিভা
চীনের ক্রীড়াব্যবস্থায় একটি শিশু শুরুতেই পেশাদার খেলোয়াড় হয়ে যায় না। সাধারণ স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই আগ্রহ ও সম্ভাবনা দেখা যায়। এরপর আসে প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতা ও বাছাইয়ের ধাপ।
সাংহাইয়ের বর্তমান ব্যবস্থাতেও এই ধারণাটি স্পষ্ট। শহরটি ক্রীড়া বিদ্যালয়, সাধারণ স্কুল ও বেসরকারি ক্লাবকে যুক্ত করে তিন স্তরের একটি যুব ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাংহাইয়ে নিবন্ধিত যুব অ্যাথলেটের সংখ্যা ৬২ হাজার এবং যুব কোচের সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। শুহুই জেলাতেও প্রতিভা খোঁজার প্রক্রিয়াকে আরো বিস্তৃত করা হয়েছে। ২০২৫ সালে সেখানে প্রথমবারের মতো ক্রস-ইভেন্ট ট্যালেন্ট সিলেকশন টেস্ট আয়োজন করা হয়। অর্থাৎ কোনো শিশুকে শুধু একটি খেলায় সীমাবদ্ধ না রেখে তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতার সঙ্গে কোন খেলাটি বেশি মানানসই, সেটিও দেখার চেষ্টা চলছে। এখানেই চীনের মডেলটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—খেলোয়াড় খোঁজার কাজ শুধু কোচের চোখের ওপর ছেড়ে দেওয়া নয়।
সপ্তাহে পাঁচ দিন, অন্তত ১০ ঘণ্টা
খেলাধুলার সঙ্গে পড়াশোনার ভারসাম্য কিভাবে রাখা যায়, সেটিও এই ব্যবস্থার বড় অংশ। সাংহাইয়ের ‘একটি ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ-পথ’ বা ‘ই থিয়াও লং’ স্কুলব্যবস্থায় নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলোর শিক্ষার্থী-অ্যাথলেটদের সপ্তাহে সাধারণত অন্তত পাঁচবার অনুশীলন করতে হয় এবং সাপ্তাহিক প্রশিক্ষণের সময় কমপক্ষে ১০ ঘণ্টা। ছুটির সময়ও প্রশিক্ষণের আলাদা ব্যবস্থা থাকে। তবে বয়স, লিঙ্গ ও খেলোয়াড়ের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের মাত্রা নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ অনুশীলন এখানে আলাদা কোনো অতিরিক্ত কাজ নয়। শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গেও সেটিকে যুক্ত করার চেষ্টা রয়েছে।
শুহুইয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাতেও একই বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। জেলা কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন স্কুলের ভেতর ও বাইরে মিলিয়ে অন্তত দুই ঘণ্টা শারীরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে স্কুল, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করার কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
কোচ শুধু মাঠে থাকেন না
চীনের এই ব্যবস্থায় কোচের ভূমিকাও বদলাচ্ছে। শুধু অনুশীলনের সময় নির্দেশনা দেওয়া নয়, স্কুল পর্যায় থেকেই পেশাদার কোচকে যুক্ত করার চেষ্টা রয়েছে। শুহুই জেলার পরিকল্পনায় ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৫০ জন পেশাদার কোচকে স্কুলে পাঠানোর লক্ষ্য ছিল। উদ্দেশ্য—স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক ও পেশাদার কোচের অভিজ্ঞতাকে এক জায়গায় আনা। শুহুইয়ের স্কুল ফুটবল কোচ চেন জিপিং মনে করেন, শিশুদের ক্ষেত্রে শুধু নিখুঁত কৌশল দেখা যথেষ্ট নয়। একটি স্কুলভিত্তিক ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি বলেন, তাদের কারও কারও কৌশল হয়তো এখনও পুরোপুরি পরিণত নয়, কিন্তু খেলার প্রতি আগ্রহ ও মাঠে লড়াই করার মানসিকতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
২০২৬ সালের সরকারি নথিতেও বলা হয়েছে, স্কুলে পেশাদার কোচ পাঠানো এবং পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীন কোচের পদ তৈরির উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি সরকার, স্কুল, পরিবার ও সমাজ—এই চার পক্ষকে যুক্ত করে যুব ক্রীড়ার কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। ফলে একটি শিশুর প্রশিক্ষণ শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার পড়াশোনা, শারীরিক সক্ষমতা, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ বিকাশ—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার অংশ করার চেষ্টা থাকে।
বিজ্ঞানও আছে মাঠে
শুহুইয়ের পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গে আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞানের সংযোগটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালের একটি সরকারি প্রতিবেদনে এই বিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক প্রতিভা বাছাই ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কথা উঠে এসেছিল। সেখানে মৌসুমি বৈজ্ঞানিক নির্বাচন পরীক্ষা এবং এফএমএস বা ফাংশনাল মুভমেন্ট স্ক্রিনিং ব্যবহার করে খেলোয়াড়দের নড়াচড়া, নমনীয়তা ও স্থিতিশীলতা মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছিল। এখন সেই ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। সাংহাইয়ের ২০২৫ সালের যুব ক্রীড়া কর্মপরিকল্পনায় তরুণ অ্যাথলেটদের প্রশিক্ষণের চাপ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ-মনিটরিং ব্যবস্থা উন্নত করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন খেলায় তরুণদের প্রশিক্ষণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
চীনের বৃহত্তর ক্রীড়া ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কোথাও বাতাসের গতি অনুকরণ করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, আবার ডাইভিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে খেলোয়াড়ের আকাশপথের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ ছোট বয়সের একজন খেলোয়াড়কে শুধু বেশি অনুশীলন করানোই লক্ষ্য নয়; কীভাবে অনুশীলন করলে তার শরীর ও দক্ষতার সর্বোচ্চ উন্নতি হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিযোগিতা ছাড়া বাছাই অসম্পূর্ণ
প্রশিক্ষণের পর আসে প্রতিযোগিতা। কারণ অনুশীলনে ভালো করলেই যে ম্যাচ বা প্রতিযোগিতায় ভালো করবে, তার নিশ্চয়তা নেই। সাংহাইয়ে ২০২৫ সালের যুব ক্রীড়া প্রতিযোগিতার তালিকায় ছিল ফুটবল, বাস্কেটবল, ভলিবল, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, টেনিস, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, ডাইভিং, নৌকাবাইচ, জিমন্যাস্টিকস, ফেন্সিং, তীরন্দাজি, শুটিং, সাইক্লিংসহ মোট ১৫টি বড় ক্রীড়া এবং ২৫টি উপশাখা। এসব প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য শুধু পদক দেওয়া নয়—ভবিষ্যতের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের সামনে আনার ব্যবস্থাও। শুহুইয়ের ২০২৫ সালের ফলাফলও দেখায়, এই কাঠামো থেকে নিয়মিত খেলোয়াড় উঠে আসছে।
ওই বছর জেলা থেকে সাংহাইয়ের প্রথম সারির দলগুলোতে ১৯ জন এবং দ্বিতীয় স্তরের উচ্চমানের যুব দলে ৬৮ জন খেলোয়াড় পাঠানো হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের যুব প্রতিযোগিতায় শুহুইয়ের খেলোয়াড়েরা ২৯টি প্রথম স্থান, ২০টি দ্বিতীয় এবং ২৭টি তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। শুহুইয়ের এক স্কুল ফুটবল কোচের কথায়, শিশুরা এখানে শুধু ফুটবল শেখে না; প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়াটাও শেখে। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার—একজন খেলোয়াড়ের পথটা সরাসরি স্কুল থেকে জাতীয় দল নয়। মাঝখানে রয়েছে একাধিক স্তর, একাধিক পরীক্ষা ও একাধিক প্রতিযোগিতা।
সবাই কি অলিম্পিয়ান হবে?
না। আর বর্তমান ব্যবস্থার লক্ষ্যও এমন নয় যে প্রত্যেক শিশুকে অলিম্পিয়ান বানাতে হবে। চীনের যুব ক্রীড়া নীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে শারীরিক সুস্থতা ও শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বেড়েছে। সাংহাইয়ের ২০২৫ সালের পরিকল্পনায়ও যুবকদের ক্রীড়া দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি আজীবন ব্যায়ামের অভ্যাস তৈরির কথা বলা হয়েছে। চেন জিপিংয়ের কথাতেও সেই বাস্তবতার ছাপ রয়েছে। তাঁর মতে, খেলাধুলায় অংশ নেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। প্রত্যেক শিশু পেশাদার খেলোয়াড় হবে—এমন প্রত্যাশা না রেখেও তাদের খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত রাখা যায়। ২০২৫ সালে সাংহাইয়ের বিভিন্ন যুব ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সংখ্যা ছিল ৫০.৮৪ লাখ। এর মধ্যে স্কুল, কমিউনিটি ও ছুটির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও ছিল। শিশুদের দুই থেকে তিনটি ক্রীড়া দক্ষতা শেখানোর লক্ষ্য নিয়েও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ বড় তারকা তৈরি হবে—এমন সম্ভাবনা হয়তো সবার নেই। কিন্তু খেলাধুলার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগটা অনেকের জন্য তৈরি করা হচ্ছে।
এখানেই আসল পার্থক্য
শুহুই জেলা যুব ক্রীড়া বিদ্যালয়ের গল্প আসলে একটি স্কুলের গল্প নয়। এটি একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থার গল্প। একটি শিশু আজ হয়তো স্থানীয় প্রতিযোগিতায় খেলছে। কাল সে জেলা দলে যাবে। সেখান থেকে সাংহাইয়ের যুব দলে। এরপর জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ। কেউ হয়তো একসময় অলিম্পিকে যাবে। কেউ তার আগেই থেমে যাবে। কেউ আবার খেলাধুলার বাইরে অন্য পেশায় চলে যাবে। কিন্তু ব্যবস্থাটি চেষ্টা করছে, যেন প্রতিটি ধাপে তার সামনে একটি পথ থাকে। এই পথের শুরুতে আছে স্কুল। এরপর কোচ। তারপর প্রশিক্ষণ। প্রতিযোগিতা। বিজ্ঞান। পরিবার। স্থানীয় প্রশাসন। সবকিছুকে একসঙ্গে ধরে রাখার চেষ্টা।
সাংহাইয়ের ক্রীড়া ব্যবস্থার বর্তমান পরিসরও সেটিই বলছে। শহরটি শুধু ক্রীড়া বিদ্যালয়ের ওপর নির্ভর করছে না; সাধারণ স্কুল ও বেসরকারি ক্লাবকেও একই প্রতিভা তৈরির ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করছে।
পদকের গল্প আসলে আরও আগে শুরু
অলিম্পিকের মঞ্চে যখন কোনো চীনা অ্যাথলেট পদকের জন্য দাঁড়ান, তখন ক্যামেরা তার মুখের দিকে থাকে। দেখা যায় কয়েক মিনিটের প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেই কয়েক মিনিটের গল্প আসলে বহু বছরের। হয়তো শুরুটা হয়েছিল একটি স্কুলের ছোট মাঠে। কোনো কোচ প্রথম তার দৌড় দেখে থেমেছিলেন। কোনো শিক্ষক তাকে প্রতিযোগিতায় পাঠিয়েছিলেন। কোনো পরীক্ষায় তার শারীরিক সক্ষমতা নজরে এসেছিল। এরপর ধাপে ধাপে সে ঢুকেছে প্রশিক্ষণের বড় কাঠামোয়। শুহুইয়ের গল্প তাই চীনের ক্রীড়া ব্যবস্থার একটি ছোট ছবি। এখানে অলিম্পিক পদকের নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু পদকের জন্য প্রস্তুত হওয়ার একটি পথ আছে।
আর সেই পথের শুরুটা হয় অনেক আগে—যখন শিশুটি এখনো জানেই না, একদিন সে অলিম্পিকের মঞ্চে দাঁড়াতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন