প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের আগ্রায়, যমুনার তীরে প্রতিষ্ঠিত তাজমহল, বিশ্বের কোটি মানুষের একটি প্রিয় গন্তব্য। এটি আধুনিক সপ্তম আশ্চর্যের একটি।
মোগল সম্রাট শাহজাহান, তার স্ত্রী মমতাজের স্মরণে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন।
যুগে যুগে, তাজমহল অমর প্রেমের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শাহজাহান তাজমহল নির্মাণের জন্য অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন হুমায়ুনের সমাধিসৌধ থেকে। দিল্লিতে অবস্থিত হুমায়ুনের সমাধিসৌধের জ্যামিতিক নকশা এবং বিশাল গম্বুজ পরবর্তীতে তাজমহল তৈরির ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে কাজ করেছিল।
তাজমহলের মতো অত খ্যাতি না পেলেও, ইউনেসকোর বিশ্বঐতিহ্যের অংশ হিসেবে, হুমায়ুনের সমাধিসৌধও বহু পর্যটকের পছন্দের একটি গন্তব্য। হুমায়ুনের সমাধিসৌধ নির্মাণের পেছনে রয়েছে একটি মিষ্টি প্রেমের গল্প। তাজমহল যেমন স্ত্রীর প্রতি স্বামীর প্রেমের নিদর্শন, ঠিক তেমনই হুমায়ুনের সমাধিসৌধ হলো স্বামীর প্রতি স্ত্রীর প্রেমের চিহ্ন।
১৫৫৬ সালে মোগল সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পর, তার স্ত্রী সম্রাজ্ঞী বেগা বেগম, স্বামীর স্মৃতি অমর করে রাখতে, হুমায়ুনের সমাধিসৌধ নির্মাণ করেন। ভারতীয় ইতিহাসের প্রথম বিশাল বাগান-সমাধিসৌধ হিসেবে বিবেচিত, হুমায়ুনের সমাধিসৌধ নির্মাণের কাজ শেষ হয় ১৫৭২ সালে।
প্রায় সাড়ে ৪০০ বছর আগে বেলেপাথর এবং সাদা মার্বেল দিয়ে নির্মিত হুমায়ুনের সমাধিসৌধ, আজও দিল্লির অন্যতম ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্র। তবে, গবেষণা বলছে, দিল্লির বায়ুদূষণের কারণে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আইআইটি-রুরকি এবং আইআইটি-কানপুরের এক যৌথ গবেষণায় এই তথ্য সামনে এসেছে।
গবেষণায় জানা যায়, বেলেপাথরের ওপর বায়ুদূষণের কারণে একটি কালো আস্তরণের সৃষ্টি হচ্ছে, যা সমাধিসৌধের ক্ষয়প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। 'ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব আর্কিটেকচারাল হেরিটেজ'-এ প্রকাশিত এই গবেষণায়, হুমায়ুনের সমাধিসৌধের বিভিন্ন অংশ থেকে কালো আস্তরণের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলোর রাসায়নিক উপাদান, খনিজ পদার্থ এবং আণুবীক্ষণিক গঠন বিশ্লেষণের জন্য পরীক্ষাগার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল।
গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, এই কালো আস্তরণ মূলত জিপসাম দিয়ে তৈরি। দূষিত বাতাসের সালফার ডাই-অক্সাইড যখন ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ ধূলিকণার সঙ্গে আর্দ্রতার বিক্রিয়া করে, তখন এই জিপসাম খনিজ সৃষ্টি হয়। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, এই জিপসামের স্তর যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণ কাজ, রাস্তার ধুলো, জৈববস্তু পোড়ানো এবং শিল্প দূষণ থেকে আসা কালি, ধূলিকণা এবং ক্ষুদ্র ধাতব কণাকে আটকে রেখে কালো প্রলেপ তৈরি করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সমাধিসৌধের যে অংশগুলো বৃষ্টির আড়ালে থাকে, সেখানে সবচেয়ে পুরু কালো আস্তরণ তৈরি হয়েছে। কারণ এই অন্ধকার জায়গাগুলোতে দূষক জমা হতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, বৃষ্টির সরাসরি পতন ঘটানো স্থানে তুলনামূলকভাবে পাতলা আস্তরণ রয়েছে, কারণ বৃষ্টি কিছু দূষক ধুয়ে ফেলে।
গবেষকদের মতে, এই কালো আস্তরণ কেবল একটি উপরিভাগের দাগ নয়। যে রাসায়নিক বিক্রিয়াটি এই আস্তরণ তৈরি করে, তা ধীরে ধীরে বেলেপাথরকে দুর্বল করে। ফলে এটি আবহাওয়ার ক্ষয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির প্রতি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তারা জানান, এই ফলাফলগুলি হুমায়ুনের সমাধিসৌধের ক্ষয়ের সঙ্গে বায়ু দূষণের সরাসরি সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেয় এবং এটি কর্তৃপক্ষকে স্মৃতিস্তম্ভটির জন্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা সম্পাদনে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণায় পরীক্ষিত সংরক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে পর্যায়ক্রমিক কালো আস্তরণ অপসারণ করা, স্মৃতিস্তম্ভের আশপাশের দূষণ ক্রমাগত নজরদারি করা এবং ব্যবহারের আগে সুরক্ষামূলক প্রলেপগুলোর মূল্যায়ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিকারক আস্তরণ তৈরির প্রক্রিয়াকে ধীর করতে এটি পরিবেশবান্ধব পরিবহন এবং কম-নির্গমন জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎসেই দূষণ কমানোর সুপারিশ করে।
গবেষকরা বলেন, এই ফলাফলগুলি সংরক্ষণ সংস্থাগুলোকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোর অগ্রাধিকার দিতে এবং হুমায়ুনের সমাধিসৌধকে দূষণজনিত আরও ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে কৌশল তৈরি করতে সাহায্য করবে।
তবে, তাজমহল রক্ষায় ভারত সরকার যতটা সচেষ্ট, হুমায়ুনের সমাধিসৌধ রক্ষায় ততটা মনোযোগী নয়। গাড়ির ধোঁয়া থেকে রক্ষা করার জন্য তাজমহলের আশপাশে ইঞ্জিনচালিত গাড়ির প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু দিল্লির দূষিত বায়ু প্রতিনিয়ত হুমায়ুনের সমাধিসৌধের ক্ষতি করছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন