প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে নবনির্মিত সেপটিক ট্যাংকে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের কারণে বাবুরাম দেবসিংহ (৩১) নামের এক রাজমিস্ত্রি শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ তুলে ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন নিহতের চাচা বুদ্ধ চরণ দেবসিংহ। এদিকে, অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের করা মামলা তদন্তের পাশাপাশি মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে ঘটনার এবং মামলার বিষয়টি সময় সংবাদকে নিশ্চিত করেছেন দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুসা মিয়া। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের অমরখানা জামুড়ীতলী গ্রামে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়।
মৃত বাবুরাম দেবসিংহ উপজেলা চিলাহাটি ইউনিয়নের বলরামপুর নিজধাম গ্রামের মৃত আর্যমোহন দেবসিংহের ছেলে ছিলেন। পেশায় তিনি একজন রাজমিস্ত্রি শ্রমিক। এই ঘটনার ফলে গৌতম চন্দ্র রায় নামের এক শ্রমিক দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অপর শ্রমিক ভাগ্য রায় সুস্থ বোধ করায় বাড়িতে ফিরে গেছেন।
মামলার এজাহারে অভিযুক্তরা হচ্ছেন, অমরখানা জামুড়ীতলী এলাকার বাসিন্দা ও শালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য রাব্বি হোসেন (৩৮), বাবুল হোসেন (৪৪), জুয়েল ইসলাম (৩৩), বলরামপুর প্রগতিপাড়া এলাকার উত্তম রায় (২৮), অমরখানা জামুড়ীতলীর এলাকার লাভলী বেগম (৪২), রানা সরকার (২৬), সাইফুল ইসলাম (২৭), মজিবুল ইসলাম (৫৪)।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার সময় অভিযুক্ত রাব্বি ও উত্তম রায় বাবুরাম দেবসিংহকে নবনির্মিত সেপটিক ট্যাংক সংস্কারের কাজের জন্য ডেকে নিয়ে যান। সেপটিক ট্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকনা দিয়ে বন্ধ থাকায় সেখানে বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ থেকে জানা যায়, যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার অভাব এবং কোনো সতর্কতা না নিয়ে অবহেলা ও দায়সারাভাবে বাবুরামকে সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে নামিয়ে দেওয়া হয়।
ট্যাংকে নামার পরপরই বাবুরাম বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই সময় অভিযুক্তরা বাবুরামকে উদ্ধার করতে কোনো ব্যবস্থা না করায় সময়ক্ষেপণ করেন। এর ফলে বাবুরাম সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের কারণে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান। পরে অভিযুক্তরা বাবুরামের মৃতদেহ সেপটিক ট্যাংক থেকে বের করে একটি অটোভ্যানযোগে নিহতের গ্রামের বাড়ি বলরামপুর নিজধামে বাড়ির উঠানে রেখে পালিয়ে যান।
ঘটনার পরপরই দেবীগঞ্জ থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য দেবীগঞ্জ থানায় নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার রাতেই, নিহতের চাচা ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অবহেলার অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করেন।
নিহতের চাচা বুদ্ধ চরণ দেবসিংহ অভিযোগ করে জানান, বাড়ির মালিক ও সংশ্লিষ্টদের চরম অবহেলা এবং যথাসময়ে উদ্ধার না করার কারণেই রাজমিস্ত্রি বাবুরামের এই অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তিনি আসামীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
এদিকে, মামলার প্রধান আসামি ও শালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য রাব্বি হোসেন দাবি করছেন যে, ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি বলেছেন যে, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে। একই সাথে বাড়ির মালিক নবির হোসেন বলেন, তিনি ঢাকায় ছিলেন। ঘটনার দিন শ্রমিকরা মূলত জানালার কাজ করতে এসেছিলেন। সেফটি ট্যাংকটি প্রায় দেড় মাস আগে নির্মাণ করা হয়। জানালার কাজ শেষে হেড মিস্ত্রী উত্তম রায়ের নির্দেশে শ্রমিকরা ট্যাংকের ভেতরে ঢোকেন। তিনি দাবি করেন, তাদের ট্যাংকের ভেতরে ঢুকতে বাধ্য করা হয়নি। তার মা তখন বাড়িতে একা ছিলেন। শ্রমিকদের ডাকাডাকি শুনে তিনি এগিয়ে গিয়ে তাদের অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করেন।
এদিকে, আরেক শ্রমিক ভাগ্য রায়ের সাথে কথা হয়। তিনি জানান, হেড মিস্ত্রি বাবুরাম ও গৌতমকে সেফটি ট্যাংকের সেন্টারিং খুলতে বলেছিলেন। প্রথমে বাবুরাম, পরে গৌতম ভেতরে ঢোকেন। তাদের বের করতে তিনি ভেতরে ঢুকে পড়েন কিন্তু নিঃশ্বাস নিতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যান। পরে জ্ঞান ফিরলে তিনি দেখতে পান, তাকে অটোতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বাবুরাম বা তারা এর আগে কখনো সেফটি ট্যাংকের ভেতরে সেন্টারিংয়ের কাজ করেনি।
দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুসা মিয়া মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সময় সংবাদকে বলেন, মূলত অবহেলার অভিযোগ তুলে ঘটনাপ্রবাহের দিন গভীর রাতে মামলাটি দায়ের করেন নিহতের চাচা। এদিকে, এজাহারটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সাথে মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন