প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ২০০ বছরেরও বেশি সময় পর এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে। ক্রিস্টা পাইকের বিরুদ্ধে ১৮ বছর বয়সে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বুধবার এই শাস্তি কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
একাধিক আদালত ইতোমধ্যে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে নারী অধিকারকর্মী এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন তার জীবন রক্ষার দাবি তুলেছে। তারা টেনেসির রিপাবলিকান গভর্নর বিল লির কাছে পাইকের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করার আবেদন করেছেন। তাদের যুক্তি, অপরাধ সংঘটনের সময় পাইকের বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।
এছাড়া, শৈশব ও কৈশোরে তিনি দীর্ঘদিন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এসব বিষয় তার শাস্তি নির্ধারণের সময় বিবেচনা করা উচিত বলে তারা মনে করেন। তবে সোমবার গভর্নর বিল লি পাইকের আইনজীবীদের করা ২২৬ পৃষ্ঠার ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর ফলে মৃত্যুদণ্ড ঠেকানোর শেষ আবেদনটিও খারিজ হয়ে যায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে, ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে টেনেসিতে এটি হবে প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর।
গভর্নর বিল লি ক্রিস্টা পাইকের ক্ষমার আবেদন নাকচ করে তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিবৃতিতে লি বলেন, “ক্রিস্টা গেইল পাইকের ক্ষমার আবেদনটি ভালোভাবে বিবেচনা করেছি এবং মামলাটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছি। এরপর আমি টেনেসি রাজ্যের দেওয়া দণ্ড বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে হস্তক্ষেপ করার কোনো পরিকল্পনা আমার নেই।”
১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে পাইক তার ১৭ বছর বয়সী প্রেমিক ট্যাডারিল শিপ এবং আরেক কিশোরী শ্যাডোলা পিটারসন মিলে কলিন স্লেমারকে নক্সভিলের একটি জঙ্গলে নিয়ে যান। সেখানে স্লেমারকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। তিন কিশোর-কিশোরী নক্সভিল জব কর্পসের মাধ্যমে একে অপরের পরিচিত ছিলেন।
প্রসিকিউটরদের দাবি, পাইক মনে করতেন স্লেমার তার প্রেমিকের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। হত্যার সময় তিনজনের মধ্যে শুধু পাইকের বিরুদ্ধেই মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করা হয়। শিপের বয়স তখন ১৭ বছর হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং বর্তমানে তিনি প্যারোলের জন্য যোগ্য। অন্যদিকে, শ্যাডোলা পিটারসন পাইক ও শিপের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। পরে তাকে প্রবেশনের সুযোগ দেওয়া হয়।
ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তিনি আধুনিক যুগে ১৮ বছর বয়সে সংঘটিত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড পাওয়া প্রথম ব্যক্তি হবেন। এ ছাড়া ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড পুনরায় চালুর পর পাইক হবেন দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১৯তম নারী।
পাইকের আইনি লড়াই প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত সপ্তাহে টেনেসি সুপ্রিম কোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার আবেদন নাকচ করে দিয়েছে। তবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে করা একটি আলাদা আপিল এখনো বিচারাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য পাইকের আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেননি।
এদিকে, নিহত কলিন স্লেমারের মা মে মার্টিনেজের সঙ্গেও দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট যোগাযোগ করতে পারেনি। তবে স্থানীয় গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রত্যক্ষ করতে তিনি ও তার স্বামী ফ্লোরিডা থেকে টেনেসি যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
নক্সভিলের এনবিসি ১০ নিউজকে মার্টিনেজ তার প্রয়াত মেয়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, “সে আর আমার সঙ্গে নেই। প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টা, প্রতি মিনিটে আমি তাকে হারানোর কষ্ট অনুভব করি।” তিনি টিভি চ্যানেলটিকে বলেন, পাইকের উদ্দেশে তার কিছু বলার নেই।
পাইকের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে তার আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন, শৈশব থেকেই তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার ছিলেন এবং গুরুতর মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। তার আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ছোটবেলা থেকেই যৌন নির্যাতনের শিকার হন এবং ১১ ও ১৭ বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হন। পরে পাইকের বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) শনাক্ত হয়।
আইনজীবীদের দাবি, ১৯৯৬ সালের বিচারের সাজা নির্ধারণের পর্যায়ে জুরির সামনে পাইকের অতীতের এসব তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। একই সঙ্গে ওই অপরাধ সংঘটনের সময় তার বয়স মাত্র ১৮ বছর ছিল—এ বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি বলে তারা দাবি করেন।
পাইকের আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে বলেন, শৈশবজুড়ে যেসব মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তার যত্ন ও কার্যকর হস্তক্ষেপ পাওয়ার কথা ছিল, তারা তাকে ব্যর্থ করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী সেই তরুণী এখন আর আগের অবস্থায় নেই। বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী পাইক নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত, নিজের মানসিক সমস্যার চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং কারাগারে থাকা অন্য নারীদের সহায়তা ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
আইনজীবীরা আরো দাবি করেছেন, পাইকের মা গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত মদ পান করতেন। তাদের মতে, এর কারণে পাইকের মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে। পরে তার বাইপোলার ডিসঅর্ডার ধরা পড়ে।
আইনজীবীদের যুক্তি, শৈশবের নির্যাতন ও মানসিক সমস্যার কারণে ১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ক্যাম্পাসের একটি স্টিম প্ল্যান্টের পেছনে স্লেমারের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পাইক নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।
আদালতের নথি ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, স্লেমারকে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয়। এরপর তাকে মারধর, নির্যাতন এবং ছুরি দিয়ে বারবার আঘাত করা হয়। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, পাইক পরে স্লেমারের মাথায় আঘাত করা, গলা কেটে দেওয়া এবং স্মারক হিসেবে তার মাথার খুলির একটি অংশ নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন।
পরে পাইকের প্রেমিক ট্যাডারিল শিপ আদালতে সাক্ষ্য দেন, তিনি স্লেমারের বুকে একটি পেন্টাগ্রাম এঁকে দিয়েছিলেন। বিচারে রাষ্ট্রপক্ষ হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ও অত্যন্ত নিষ্ঠুর ছিল বলে যুক্তি দেয়। রাষ্ট্রপক্ষ দুটি বিষয় প্রমাণ করতে সক্ষম হয়।
প্রথমত, পাইক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গোপন করার চেষ্টায় অংশ নিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, হত্যার সময় স্লেমারের ওপর প্রয়োজনের চেয়েও বেশি নির্যাতন ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এসব বিষয় বিবেচনা করে জুরি পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
গত প্রায় ৩০ বছর ধরে পাইকের আইনজীবীরা বলে আসছেন, তার প্রথম দিকের আইনজীবীরা মামলায় তার দীর্ঘদিনের নির্যাতনের বিষয়টি ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেননি। তাদের মতে, শৈশব ও কৈশোরে বারবার নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার কর্মকাণ্ড ব্যাখ্যা করা উচিত ছিল।
যৌন নির্যাতন থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকজন আইনজীবীও পাইকের পক্ষে আদালতে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। কর্নেল স্কুল অব ল-এর মাধ্যমে টেনেসি ও মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া এসব বক্তব্যে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় পাইক তার অতীতের ধর্ষণের ঘটনা আবারও মানসিকভাবে অনুভব করতে পারেন।
আইনজীবীরা লিখেছেন, “তিনি সম্ভবত মনে করবেন, তাকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হচ্ছে।” জর্জিয়া কোয়ালিশন এগেইনস্ট ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের উদ্যোগে ১০০টির বেশি সংগঠন ও বিশেষজ্ঞ গভর্নর বিল লির কাছে পাইকের মৃত্যুদণ্ড বদলে প্যারোল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার আবেদন করেছেন।
তাদের চিঠিতে বলা হয়, পাইকের অপরাধের গুরুত্ব তারা অস্বীকার করছেন না। তবে শৈশবে তার ওপর হওয়া যৌন নির্যাতন তার আচরণ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করে। ক্ষমার আবেদনে আরো বলা হয়েছে, টেনেসিতে আধুনিক সময়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ২০০ জনের বেশি মানুষের মধ্যে মাত্র আটজন অপরাধের সময় ১৮ বছর বয়সী ছিলেন। ওই সাতজনই পুরুষ এবং পরে তাদের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হয়েছে।
ক্ষমার আবেদনে বলা হয়েছে, টেনেসিতে কিশোর অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় না। কারণ, কৈশোরে মানুষের মস্তিষ্ক ও আচরণ পুরোপুরি বিকশিত হয় না। এই বিকাশ সাধারণত ২০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলতে পারে। আবেদনের সঙ্গে প্রায় ১০০ পৃষ্ঠার চিঠিও জমা দেওয়া হয়েছে। এসব চিঠি লিখেছেন পাইকের মা, সহবন্দি, কারাগারের ধর্মযাজক, পারিবারিক বন্ধু, সাবেক সহকর্মী এবং তার সঙ্গে কাজ করা চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীরা।
চলতি বছরের শুরুতে টেনেসি সুপ্রিম কোর্ট পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে কিছু প্রশ্ন খতিয়ে দেখতে একজন বিশেষ মাস্টার নিয়োগ করে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তিনি অস্বাভাবিক বা বেআইনি যন্ত্রণার শিকার হবেন কি না, সেটিও বিবেচনা করতে বলা হয়।
এ ছাড়া যৌন নির্যাতনের অতীত ও পিটিএসডি থাকার কারণে মৃত্যুদণ্ডের দুই সপ্তাহ আগে তাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে স্থানান্তর করলে তা অতিরিক্ত মানসিক কষ্ট তৈরি করবে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে বলা হয়। ওই কারাগারে তাকে পুরুষ কারাকর্মীদের তত্ত্বাবধানে থাকতে হতো।
আগস্টে তিন দিনের শুনানিতে পাইকের আইনজীবীরা টেনেসির প্রাণঘাতী ইনজেকশনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতির বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। তারা মে মাসে সাজাপ্রাপ্ত খুনি টনি ক্যারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
আইনজীবীরা বলেন, পাইকের রক্তের একটি রোগ রয়েছে এবং তার ছোট শিরার কারণে প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার সময় জটিলতা, তীব্র ব্যথা ও রক্তপাতের ঝুঁকি বেশি। তাই তারা ইনজেকশনের বদলে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আবেদন করেন। তবে সিনিয়র বিচারক ডব্লিউ. মার্ক ওয়ার্ড রাজ্যের পক্ষে রায় দেন।
তিনি বলেন, টেনেসির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি পাইকের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করবে না। ফলে নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ খোলা থাকে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন