প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশে আলুর উৎপাদন গত কয়েক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর ফলে মাঠে বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দরপতন এবং রপ্তানি ব্যর্থতায় চাষীরা সমস্যায় পড়ছেন। আলুচাষীদের সংকট কোনোভাবেই মিটছে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে এই তথ্য পাওয়া গেছে। দেশের বার্ষিক চাহিদা বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে প্রায় ৮০/৯৫ লাখ টন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী দেশে আলুর চাহিদা প্রায় ৮৯ লাখ টন। ফলে গত মৌসুমে উদ্বৃত্ত ছিল আনুমানিক ২০-২৬ লাখ টন আলু। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায় যে ২০২৬ সালে দেশে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে এবং চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ টন উদ্বৃত্ত রয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন কমলেও উদ্বৃত্তের সমস্যা এখনও বিদ্যমান।
দেশের আলুর বড় অংশ উৎপাদন হয় উত্তরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ মিলে প্রায় ৮৭ লাখ ৯৮ হাজার ১৮৮ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে, যা জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৭৬ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে এই দুই বিভাগে প্রায় ৮৪ লাখ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
রংপুর বিভাগে চলতি মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন, যা গত মৌসুমে ৫৫ লাখ ৫৯ হাজার ৭৩৯ টন ছিল। যদিও উৎপাদন কিছুটা কমেছে, রংপুর এখনও জাতীয় উৎপাদনে সবচেয়ে বড় অবদানকারী অঞ্চল। অন্যদিকে রাজশাহী বিভাগেও উৎপাদন ব্যাপক। রাজশাহী জেলায় ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১০ লাখ ৩০ হাজার ৫১৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল, যেখানে জেলার বার্ষিক চাহিদা মাত্র ১ লাখ ১৩ হাজার ১৪৫ টন। ফলে স্থানীয় চাহিদার তুলনায় বিপুল পরিমাণ আলু উদ্বৃত্ত থেকে যায় এবং তা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করতে হয়।
রাজশাহী ও রংপুরে চাহিদা কত?
বিভাগভিত্তিক সরকারি আলু-চাহিদার পৃথক হিসাব না থাকায় ২০২২ সালের জনসংখ্যার অনুপাতে জাতীয় চাহিদা ৮৯ লাখ টন ধরে আনুমানিক হিসাব করলে, রাজশাহী বিভাগের ২.০৩ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে প্রায় ১১.০ লাখ টন আলুর চাহিদা রয়েছে। রাজশাহী ও রংপুর মিলিয়ে লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে রংপুর বিভাগ ১.৭৬ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে ৫১.৮ লাখ টন আলু উৎপাদন করে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ৩ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে চাহিদা প্রায় ২০.৫ লাখ টন, উৎপাদন হয় প্রায় ৮৪ লাখ টন আলু।
এক বিঘা জমির আলু উৎপাদনে খরচ কত?
চলতি মৌসুমে উত্তরাঞ্চলে এক বিঘা আলু উৎপাদনে খরচ অঞ্চল ও জাতভেদে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। মাঠপর্যায়ের হিসাবে অনেক এলাকায় ৭০-৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। এর মধ্যে বীজে ২৫-৩০ হাজার, সার ও কীটনাশকে ১৫-১৮ হাজার, শ্রমে ১২-১৫ হাজার এবং সেচ ও অন্যান্য খরচে আরও ১৩-১৭ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে। তবে সব এলাকায় খরচ একরকম নয়। জয়পুরহাটে ২০২৫-২৬ মৌসুমে কৃষি বিভাগের হিসাবে বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ৪১ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের হিসাবে ৫০-৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচের কথাও এসেছে। ফলন ভালো হলে এক বিঘায় প্রায় ৭৫-৮৫ মণ পর্যন্ত আলু পাওয়া যায়। কিন্তু বাজারে ১৫/২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলে মোট বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা। ফলে একই পরিমাণ টাকা খরচের বিপরীতে কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে।
আলু রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা
বাংলাদেশের আলু রপ্তানির বাজার বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশ থেকে ৬২ হাজার ১৩৫ টন আলু রপ্তানি হয়েছে, যা আগের কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বাংলাদেশের আলুর বাজার হিসেবে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, শ্রীলঙ্কা, ওমান, কানাডা ও মালদ্বীপের মতো দেশ রয়েছে।
তবে উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানি এখনও অত্যন্ত কম। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে রপ্তানিযোগ্য মানের জাত, রোগমুক্ত আলু, মানসম্মত প্যাকেজিং, ফাইটোস্যানিটারি সনদ, ট্রেসেবিলিটি, পরীক্ষাগার সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরবরাহ-যোগাযোগের দুর্বলতা। সরকারি কৃষি বিষয়ক বিশ্লেষণেও আলুর গুণগত বৈচিত্র্য, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দুর্বল সংযোগকে রপ্তানির বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে অতীতে ব্রাউন রট রোগ শনাক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশি আলুর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালে তা প্রত্যাহার হয়। এ ঘটনা দেখিয়েছে যে রপ্তানি বাড়াতে হলে উৎপাদন থেকে প্যাকিং ও রপ্তানি পর্যন্ত রোগমুক্ততা, ট্রেসেবিলিটি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা জরুরি।
উত্তরাঞ্চলের সুবিধা হলো এখানে দেশের সবচেয়ে বড় আলু উৎপাদন অঞ্চল অবস্থিত। বিশেষ করে রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী এলাকায় বড় আকারে আলু উৎপাদিত হয়।
কিন্তু উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংরক্ষণ ও রপ্তানি অবকাঠামো নেই। কৃষি তথ্য সার্ভিসের বিশ্লেষণেও উত্তরাঞ্চলে রপ্তানির জন্য প্লাগিং/প্যাকিং স্টেশন, রপ্তানি-উপযোগী কুলিং জোন এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন গড়ে তোলার প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে।
দেশে হিমাগার সংখ্যা কত ?
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী ৪০টি জেলা থেকে সংগৃহীত হিসাবে দেশে ৩৬৫টি চালু হিমাগার ছিল এবং মোট ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৩০ লাখ ১৩ হাজার টন। তবে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে দেশে ৩৫১টি হিমাগারে প্রায় ৩৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। সংখ্যা কম হলেও কিছু নতুন/বর্ধিত ধারণক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় মোট সক্ষমতার হিসাব ভিন্ন হয়েছে।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে ১২৬টি হিমাগার, এর মধ্যে ১২০টি সচল রয়েছে। জেলাভিত্তিক সংখ্যানুপাতে রাজশাহীতে ৪০, বগুড়ায় ৫২, জয়পুরহাট ২২, নওগাঁয় ১০, নাটোরে ৩, পাবনায় ২, সিরাজগঞ্জে ১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১টি সহ মোট ১২৬ টি হিমাগার রয়েছে। রাজশাহী জেলার ৩৮টি সচল হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪ লাখ ৩৩ হাজার ২৫০ টন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
রংপুর বিভাগে ১১৫টি হিমাগার এবং মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ টন বলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। চলতি মৌসুমের ৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন উৎপাদনের বিপরীতে এই ধারণক্ষমতা মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ। অর্থাৎ রাজশাহী ও রংপুর—দুই বিভাগে যাচাই করা সাম্প্রতিক হিসাবে মোট ২৪১টি হিমাগার রয়েছে।
সংকটের মূল কোথায়?
আলু খাতে বর্তমান সংকটকে মোটামুটি পাঁচ ভাগে দেখা যায়। এগুলো হল চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন, অপর্যাপ্ত ও অসম বণ্টনের হিমাগার, রপ্তানি বাজার সীমিত, রপ্তানিযোগ্য মান ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং কৃষকের উৎপাদন খরচের তুলনায় মাঠ পর্যায়ে অনাকাংখিতভাবে কমে যাওয়া। রংপুরে চলতি মৌসুমের উৎপাদনের মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ হিমাগারে রাখার সক্ষমতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও কৃষি খাতসংশ্লিষ্টদের প্রস্তাব অনুযায়ী উৎপাদন অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা, রপ্তানিযোগ্য জাতের সম্প্রসারণ, কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ, আধুনিক ছোট ও মাঝারি কোল্ড স্টোরেজ, রপ্তানি-প্যাকিং কেন্দ্র এবং পরীক্ষাগার সুবিধা বাড়ানো জরুরি।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে রাজশাহী-বগুড়া-জয়পুরহাট-রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে একটি সমন্বিত পটেটো এক্সপোর্ট প্রসেসিং সেকসন গড়ে তোলা গেলে উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাছাই, প্যাকিং ও রপ্তানি একই সরবরাহশৃঙ্খলের মধ্যে আনা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি নেপাল, ভুটান, ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারকে লক্ষ্য করে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে।
দেশে আলু খাতে মূল সমস্যা উৎপাদনের ঘাটতি নয়; বরং উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজার ও রপ্তানির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। দেশে যখন চাহিদার চেয়ে ২০ লাখ টনের বেশি আলু উদ্বৃত্ত থাকে, তখন সেই উদ্বৃত্তকে মূল্য সংযোজন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির মাধ্যমে কাজে লাগানোই বড় চ্যালেঞ্জ।
উত্তরাঞ্চল এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আলু উৎপাদনকারী রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলেই অবস্থিত। কিন্তু হিমাগার, কোল্ড-চেইন, রপ্তানি মান, প্যাকেজিং ও আন্তর্জাতিক বাজার-সংযোগ উন্নত না হলে বাম্পার ফলন কৃষকের জন্য লাভের বদলে লোকসানের কারণ হয়েই থাকবে বলে মনে করেন আলুচাষী, হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ী এবং রংপুর বিভাগের রপ্তানির সাথে জড়িতরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন