প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
‘একজন পুলিশ সদস্য আমার সামনে থাকা এক বড় ভাইয়ের পেটে কোমরে থাকা পিস্তল ঠেকিয়ে বলেছিল, পেছনে চলে যা, নয়তো গুলি করে দেব।’— এই বক্তব্যটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত জবানবন্দিতে তুলে ধরেন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারী মো. শাকিল আহম্মেদ।
রবিবার, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনাল-১ এ প্রসিকিউশনের ১২ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে শাকিল জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তিনি মিরপুর-১০ এলাকায় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পরদিন স্টেডিয়ামের সামনে গিয়ে তিনি দেখেন, পুলিশ ও সাদা পোশাকধারীরা ব্যারিকেড দিয়ে অবস্থান নিয়েছে। আন্দোলনকারীরা মিরপুর-১০ নম্বরে যাওয়ার অনুমতি চাইলে পুলিশ তাদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। এ সময় এক পুলিশ সদস্য পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেয়।
তিনি আরও জানান, পাশের রাস্তা দিয়ে মিরপুর-১০ নম্বরে গিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন। ফলপট্টি এলাকায় পৌঁছানোর পর তিনি দেখেন, পুলিশ, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের সদস্যরা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। তার সামনেই গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান আন্দোলনকারী মোস্তাকিন বিল্লাহ। তাকে সরিয়ে নেওয়ার সময় আরও একজনকে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেন। পরে জানতে পারেন মোস্তাকিন মারা গেছেন।
শাকিল বলেন, ৪ আগস্ট আবারও মিরপুর-১০ এলাকায় আন্দোলনে অংশ নিতে গেলে একই ধরনের হামলার মুখে পড়েন। পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাচ্ছিল। একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ একজনকে সাহায্য করতে গিয়ে তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুলি বাম নিতম্ব দিয়ে ঢুকে পেটের ভেতর দিয়ে ডান পায়ের গোড়ার দিকে বের হয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তখন তার মনে হয়েছিল, মারা গেলে হয়তো লাশও গুম হয়ে যাবে। তাই আশপাশের লোকজনকে মায়ের ফোন নম্বর দিয়ে দেন এবং কয়েকবার কালেমা পাঠ করেন। পরে তাকে প্রথমে মিরপুরের একটি হাসপাতালে এবং এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালে শাকিল জানান, দীর্ঘ চিকিৎসার পরও তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। মলদ্বার সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন ডাইলেশনের মাধ্যমে শারীরিক প্রয়োজন সারতে হয়। ডান পায়ের প্রধান ধমনী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। শক্ত খাবার খেতে পারেন না, অধিকাংশ সময় তরল খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডেও যেতে হয়েছে তাকে।
সাক্ষ্যে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ছাত্র-জনতা নিহত এবং প্রায় ২৫ হাজার মানুষ আহত বা পঙ্গু হয়েছেন। এসব ঘটনার মূল কারণ ছিল ১৯ জুলাই কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত।
শাকিলের দাবি, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং ভাইরাল হওয়া অডিওর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, কারফিউ জারির পেছনে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের ভূমিকা ছিল। তাদের পরামর্শেই পতিত স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা কারফিউ জারিতে সম্মত হন। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর সাহস পায়।
চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মোট পাঁচটি অভিযোগ এনেছে। এর মধ্যে কারফিউ জারির মাধ্যমে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি, প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তাদের নির্দেশনা ও কর্মকাণ্ডের ফলে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন