প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
হ্যারি কেন এবং জো রুট, দুই ধ্রুপদী ইংলিশ অধিনায়ক, তাদের অনন্য খেলোয়াড়সুলভ আচরণ ও পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ঐতিহ্যগত ব্রিটিশ মূল্যবোধকে ফুটিয়ে তুলেছেন। সম্প্রতি ফুটবলার হ্যারি কেন এবং ক্রিকেটার জো রুটের দীর্ঘস্থায়ী অবদান, মাঠের সংযম ও নেতৃত্বকে সম্মান জানিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এ একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
নিবন্ধটিতে আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে এই দুই তারকা স্যার আলফ র্যামসি বা ব্রায়ান ক্লোজের মতো কিংবদন্তি ইংলিশ ড্রেসিংরুমের সোনালী যুগের সঙ্গে বর্তমানের এক নিখুঁত সেতু বন্ধন তৈরি করেছেন।
এই নিবন্ধে ইংল্যান্ডের দুই সফল অধিনায়ক—হ্যারি কেন (ফুটবল) এবং জো রুট (ক্রিকেট)—এর অনন্য সাংস্কৃতিক এবং ক্রীড়াঙ্গনভিত্তিক পরিচয়কে তুলে ধরা হয়েছে। অতি-বাণিজ্যিক এবং আমেরিকান ধাঁচের চটকদার ক্রীড়া বিনোদনের এই যুগেও তারা কীভাবে নিজেদের মাটির মানুষ হিসেবে ধরে রেখেছেন, লেখায় তারই প্রশংসা করা হয়েছে।
খ্যাতি আর প্রাচুর্যের চূড়ায় পৌঁছেও কীভাবে নিজেদের অপরিবর্তিত রাখা যায়, হ্যারি কেইন ও জো রুট তার জলন্ত উদাহরণ। ক্যারিয়ারের শুরুতে লেটন ওরিয়েন্ট কিংবা মিলওয়ালের মতো ছোট ও সাধারণ ক্লাবে খেলা কেইন আজ ইংল্যান্ড ফুটবল দলের সফল অধিনায়ক। অথচ তাঁর স্বভাব ও আচরণে বিন্দুমাত্র অহংকারের ছোঁয়া লাগেনি। ঠিক এই জায়গাতেই তাঁকে মনে হয় ইংল্যান্ডের ক্রিকেট অধিনায়ক জো রুটের আপন ভাই মনে হয়। রুটও ঠিক কেইনের মতোই একজন নিরহংকার মানুষ, যাকে এক দেখায় একদম আদর্শ এক জামাতা বলে মনে হয়। ব্রিটিশ খেলাধুলায় আমূল পরিবর্তন আনার মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত ভিক্টোরিয়ান যুগের বিখ্যাত উপন্যাস ‘টম ব্রাউনস স্কুল ডেস’-এর পাতা থেকেই যেন সোজা উঠে এসেছেন এই দুই সোনালী তারকা।
ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ খেলাধুলার মূল লক্ষ্য যদি খেলোয়াড়দের উন্নত চরিত্র গঠন করা হয়ে থাকে, তবে জো রুট এবং হ্যারি কেন সেই ভাবধারার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। আধুনিক তারকা খ্যাতির চটকদার মোহ, পপ-স্টার জীবনসঙ্গী, দামি ও অতিরঞ্জিত গাড়ি কিংবা অদ্ভুত হেয়ারস্টাইল—এসবের কোনোটাই তাঁদের ছুঁতে পারেনি। কেন তাঁর শৈশবের ভালোবাসা কেট-কে বিয়ে করে চার সন্তান নিয়ে এক নিভৃত, শান্ত জীবন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে রুট তাঁর স্ত্রী ক্যারির দেখা পেয়েছিলেন ইয়র্কশায়ারের ঘরের মাঠ হেডিংলিতে।
এটা আজ প্রায় নিশ্চিত যে, কেইন এবং রুট তাঁদের নিজ নিজ খেলায় ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা করে নেবেন। অথচ এত বড় মহাতারকা হওয়া সত্ত্বেও, ছুটির দিনে স্থানীয় কোনো সাধারণ ক্লাবের হয়ে মাঠে নেমে পড়তে তাঁদের একটুও দ্বিধা হবে না। খাঁটি বা অকৃত্রিম হওয়া বলতে এটাই বোঝায়—কোটি টাকার তারকা হয়েও তাঁরা এখনো সাধারণ খেলাধুলার সেই তৃণমূল পরিবেশের সাথে নিজেদের নাড়ির টান রেখে দিয়েছেন, যেখান থেকে একদিন তাঁদের উত্থান হয়েছিল।
রুটের ক্রিকেটের হাতেখড়ি হয়েছিল শেফিল্ডের ক্লাব দিয়ে। বাবা ম্যাট যখন মাঠে খেলতেন, তখন রুট এবং তাঁর ভাই বিলি (যিনি পরে গ্ল্যামারগনের হয়ে পেশাদার ক্রিকেট খেলেন) মাঠের সীমানার বাইরে ছোট ছোট ব্যাট-বল নিয়ে মেতে থাকতেন। অন্যদিকে কেইনের শুরুটা পুরোপুরি হ্যাকনি মার্শের মতো বিখ্যাত ফুটবল মাঠ থেকে না হলেও, সেটি খুব দূরের কিছু ছিল না। আট বছর বয়সে আর্সেনাল একাডেমিতে মাত্র একটি ব্যর্থ মৌসুম কাটানো ছাড়া, কেইনের শৈশবের সিংহভাগ সময় কেটেছিল স্থানীয় পার্কের 'রিজওয়ে রোভার্স' ক্লাবের হয়ে সাধারণ ফুটবল খেলে।
এই দুই খেলোয়াড়ের কাছে শুরু থেকেই খেলাটাই ছিল ধ্যান-জ্ঞান, যা আজও অপরিবর্তিত রয়েছে। নিজেদের অসাধারণ প্রতিভার জোরে তাঁরা আজ কোটি কোটি টাকার মালিক, তবুও মনে হয় ১৯৬০-এর দশকের খেলোয়াড়দের মতো সামান্য বেতনেও তাঁরা সমান সুখে খেলে যেতে পারতেন—যদি কেবল মাঠে নামার সুযোগটুকু থাকত। তাঁদের মধ্যে এক ধরনের চিরন্তন এবং সাধারণ মানুষের গুণাবলি রয়েছে। আজ যদি স্যার আলফ রামসে বা ব্রায়ান ক্লোজের মতো অতীত যুগের কিংবদন্তি কঠোর মেজাজের কোচদের ড্রেসিংরুমেও কেইন বা রুটকে বসিয়ে দেওয়া হয়, তাঁরা সেখানেও নিমেষেই মানিয়ে নেবেন; কারণ তাঁরা খেলাধুলার মূল ভাষাটা বোঝেন।
ব্যালন ডি'অর জয়ের পর কেইন তাঁর টুইটারে একটি গভীর অর্থপূর্ণ কথা লিখেছিলেন, ‘নীরবে কঠোর পরিশ্রম করো। তোমার সাফল্যকেই তোমার হয়ে আওয়াজ করতে দাও।’ রুটের মতো কেইনও খেলার প্রতি এক অদ্ভুত নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ধরে রেখেছেন, যার সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্বমানের পেশাদার কাজের নৈতিকতা।
তবে প্রশ্ন হলো, আমরা কি ভবিষ্যতে আর কখনো তাঁদের মতো খেলোয়াড় দেখতে পাব?
ব্রিটিশ ক্রীড়া সংস্কৃতি এখন দ্রুত আমেরিকান বাণিজ্যিক মডেলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ঘরোয়া ক্রিকেটে এখন চারপাশের ঐতিহ্যবাহী টুর্নামেন্ট বাদ দিয়ে ‘দ্য হান্ড্রেড’কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রিমিয়ার লিগ এখন স্থানীয় ঘরের ছেলেদের চেয়ে বৈশ্বিক তারকাদের বেশি প্রাধান্য দেয়। এমনকি রাগবির মতো খেলা, যা একসময় অহংকার ও লোকদেখানো আচরণ কঠোরভাবে এড়িয়ে চলত, তারাও এখন নতুন তারকা হিসেবে মাঠ কাঁপানো চটপটে ও বাচাল খেলোয়াড়দের দিকে ঝুঁকছে।
খেলাধুলার জগৎ এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে, চারপাশ এখন ঔদ্ধত্যে ভরা চরিত্রদের দখলে। তাই কেইন এবং রুটের মতো প্রাচীন, খাঁটি ও নম্র মূল্যবোধের খেলোয়াড়দের খেলা যতদিন সম্ভব উপভোগ করা উচিত। বছরের পর বছর অবিরাম অনুশীলন আর ক্লান্তির ধকল নেওয়ার পরেও তাঁদের এই নিখাদ নম্রতা সত্যিই অলৌকিক। তাঁরা যখন সেঞ্চুরি করেন বা গোল করেন—কিংবা ব্যালন ডি'অর জেতেন—তখন সাধারণ ক্রীড়াপ্রেমীদের আনন্দটা বহুগুণ বেড়ে যায়; কারণ মনে হয়, তাঁদের এই মাটির মানুষ হয়ে জেতার সাফল্যে আমাদেরও ছোট্ট একটা অংশ রয়েছে।
—দ্য টেলিগ্রাফের জনপ্রিয় ক্রীড়া লেখক সাইমন ব্রিগসের কলাম থেকে অনূবাদিত
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন