প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরে হাম (মিজলস) সংক্রমণের হার ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশে সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানিয়েছে, রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২ হাজার ৩১৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। জুলাইয়ের শেষ হওয়ার আগেই এই সংখ্যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের সংক্রমণকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সিডিসির প্রকাশিত সর্বশেষ (শুক্রবার) তথ্যানুসারে, ২০২৬ সালের সংক্রমণের এই সংখ্যা ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সালের বড় প্রাদুর্ভাবের পর এক বছরে সর্বোচ্চ। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ হামে আক্রান্ত হয় এবং ১২৩ জনের মৃত্যু ঘটে।
জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের মহামারিবিদ্যার অধ্যাপক উইলিয়াম মস বলেন, “এই রেকর্ডটি আরও উদ্বেগজনক, কারণ এখনও মাত্র জুলাই মাস চলছে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে হামের সংক্রমণের বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ শিশুদের টিকাদানের হার ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকেই এমএমআর (হাম, মাম্পস ও রুবেলা) টিকা গ্রহণের হার কমতে শুরু করে। এদিকে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তি ও সন্দেহও পরিস্থিতিকে আরও জটিল বলে মনে হচ্ছে।
অনেক বিশেষজ্ঞ অভিযোগ করেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের টিকাবিরোধী অবস্থান এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয় এমন দাবি প্রচারের ফলে জনগণের মধ্যে টিকা সম্পর্কে আস্থার সংকট আরও বেড়েছে।
সিডিসির জানিয়েছে, ২৩ জুলাই পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশই নবজাতক থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু ও কিশোর। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অংশ প্রায় ২০ শতাংশ।
সংক্রমিত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। অন্যদিকে, ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার ৩ শতাংশ।
চলতি বছরে হাম রোগের কারণে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৫১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যদিও গুরুতর ক্ষেত্রে হাম প্রাণঘাতী হতে পারে, তথাপি ২০২৬ সালের জানুয়ারির পর এ রোগে নতুন কোনও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
গত বছরের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫ সালের পুরো বছরজুড়েযুক্তরাষ্ট্রে হামে আক্রান্ত হয়েছিল ২ হাজার ২৮৯ জন। অর্থাৎ, চলতি বছরের মাত্র সাত মাসেই সেই সংখ্যাকে ২৯ জন ছাড়িয়ে গেছে।
গত বছর হামে আক্রান্তদের মধ্যে ২৪৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, যার মধ্যে মৃত্যু হয় তিনজনের।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও চিকিৎসকদের মতে, এটি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এমএমআর টিকা।
সিডিসি জানিয়েছে, দুটি ডোজ এমএমআর টিকা গ্রহণ করলে হাম প্রতিরোধে কার্যকারিতা প্রায় ৯৭ শতাংশ।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে কিন্ডারগার্টেন পর্যায়ের শিশুদের মধ্যে টিকাদানের গড় হার নেমে এসেছে ৯২ দশমিক ৫ শতাংশে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকা গ্রহণ করা আবশ্যক, যাতে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
বর্তমানে অন্তত ১৬টি অঙ্গরাজ্যে টিকাদানের হার ৯০ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। এসব অঙ্গরাজ্যের অনেকগুলোতেই চলতি বছরে হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের অনেকে মনে করেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে জনঅসন্তোষ এবং টিকাবিরোধী প্রচারণা টিকাদানের হার কমিয়ে দিয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র বহুবার দাবি করেছেন, হামের টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক রয়েছে। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন দাবির কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গত জুনে তিনি সিডিসির টিকাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ পরামর্শক কমিটির সব সদস্যকে বরখাস্ত করেন। এই কমিটি যুক্তরাষ্ট্রে কোন টিকা কীভাবে এবং কাদের দেওয়া হবে, সে সম্পর্কে সরকারকে সুপারিশ করে।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের সভাপতি অ্যান্ড্রু রেসিন বলেন, “গত বছরের শুরু থেকেই ফেডারেল নেতৃত্ব হামকে তেমন গুরুতর নয় বলে উপস্থাপন করছে এবং এমএমআর টিকা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে।”
তিনি বলেন, “২০২৬ সালের অর্ধেক সময় পার হতে না হতেই যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯১ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব ছিল এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন শিশুরা।”
সিডিসির তথ্যমতে, চলতি বছরের আক্রান্তদের ৯৩ শতাংশই আগে কোনও এমএমআর টিকা নেয়নি। বাকিদের মধ্যে অল্পসংখ্যক ব্যক্তি সংক্রমণের আগে এক বা দুই ডোজ টিকা নিয়েছিল।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫টি অঙ্গরাজ্য ও রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। মোট সংক্রমণের ৯৩ শতাংশই ৩৫টি পৃথক প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছে সাউথ ক্যারোলাইনা, উটাহ, অ্যারিজোনা, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ভার্জিনিয়া ও পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে।
এর মধ্যে মাত্র ১৬টি সংক্রমণ বিদেশ থেকে আসা ভ্রমণকারীদের মধ্যে শনাক্ত হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সাউথ ক্যারোলাইনার প্রাদুর্ভাবে প্রায় এক হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে হামমুক্ত ঘোষণা করার পর এটিই সবচেয়ে বড় একক প্রাদুর্ভাব।
এই পরিস্থিতিতে দেশটির ‘হামমুক্ত’ মর্যাদা বহাল থাকবে কি না, তা এখন পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। প্যান আমেরিকান হেলথ অরগানাইজেশন (পাহো) জানিয়েছে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন