প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
উদ্যোক্তারা কারখানা নির্মাণ করেন, কিন্তু রাজনৈতিক ঐক্য, নীতির ধারাবাহিকতা এবং অভিন্ন জাতীয় লক্ষ্য একটি দেশকে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করে। অর্থনীতির উন্নত দেশগুলোতে দলীয় রাজনৈতিক সংঘাতের অবসান ঘটে কারখানার প্রবেশদ্বারে। কারণ, রাজনীতিকেরা উপলব্ধি করেন—দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতগুলোই জাতীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে এসব খাতকে ব্যবহার করা মানে নিজের অর্থনৈতিক ভিত্তিকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে অবশ্যই সব ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও হস্তক্ষেপের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। সম্প্রতি ডেইলি অবজার্ভারের এক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে এক গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতার সম্মুখীন। দেশের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাকশিল্প ক্রমেই এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক সংঘাতের ময়দানে পরিণত হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলের চলমান অস্থিরতার নেপথ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি অভিযোগ করেছেন, সীমান্তের ওপার থেকে সক্রিয় কিছু শত্রুভাবাপন্ন চক্র তৈরি পোশাকশ্রমিকদের উসকে দিচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, পরিকল্পিতভাবে শিল্পাঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা এবং দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করাই তাদের উদ্দেশ্য।
এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে দাবি করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) শিল্পাঞ্চলে নাশকতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পেছনে একটি পরিকল্পিত নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্তে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এবং পুলিশের সাবেক দুই অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের বিরুদ্ধে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা উসকে দেওয়া ও অর্থায়নের অভিযোগ উঠেছে।
শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে একটি মহল নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করেছে এবং সহিংসতা ও নাশকতার আড়াল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে—এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। মিরপুরে গত ৩ নভেম্বর এক পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তদন্তের দাবি।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে যখন উত্তেজনা ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে, তখন এই রাজনৈতিক সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এক বিরল উদ্বেগ ও ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে।
দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানা, বিশেষ করে বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রসমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ নেপথ্যে কলকাঠি নাড়াদের উদ্দেশে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিকে কোনো ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না।
শিবু মার্কেট ও কাথারপুল এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে, যখন শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন আজাদ জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেন—সরকার ও কারখানার মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির অধিকারের প্রতি সমর্থন জানালেও একটি অদৃশ্য মহল সেই ন্যায্য আন্দোলনকে জাতীয় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
দলীয় রাজনৈতিক সংঘাত থেকে এই শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ার পরিণতি হবে ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান ১০ শতাংশেরও বেশি। রাজনৈতিক নাশকতা ও অস্থিরতার কারণে মাত্র ৯০ দিনের জন্যও যদি এই শিল্পের উৎপাদনব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে, তাহলে দেশের অর্থনীতি এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, টানা তিন মাস উৎপাদন বন্ধ থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য আমদানির সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং অতিমূল্যস্ফীতির চাপে টাকার বিনিময়মূল্য ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তবে এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর আঘাত গিয়ে পড়বে কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর। ৯০ দিনের জন্য পোশাকশিল্প বন্ধ হয়ে গেলে সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে ৪০ লাখের বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান, যাঁদের অধিকাংশই নারী। তাঁদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ২ কোটিরও বেশি পরিবারের সদস্য চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়বেন। এর ফলে মিরপুর, গাজীপুর, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে ব্যাপক সামাজিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার জন্য আন্তর্জাতিক ফ্যাশনবাজার অপেক্ষা করবে না। উৎপাদন ও সরবরাহে একটি মৌসুমের ব্যর্থতাই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে তাদের শত শত কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ স্থায়ীভাবে ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে সরিয়ে নিতে প্ররোচিত করতে পারে। এমন ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের এক দশকও লেগে যেতে পারে।
একই সঙ্গে পোশাকশিল্পের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত দেশের ব্যাংকিং খাতও বড় ধরনের সংকটে পড়বে। কারখানাগুলোর সঙ্গে ব্যাংকের বিপুল ঋণ ও অর্থায়ন সম্পর্ক রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাপক ঋণখেলাপির ঝুঁকি তৈরি হবে, ব্যাংকের তারল্য সংকট বাড়বে এবং পুরো বেসরকারি অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
তিন মাসের অচলাবস্থা কোনো সাময়িক বিরতি নয়; এটি হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কয়েক দশকের শিল্পোন্নয়নের অর্জনকে স্থায়ীভাবে বিপর্যস্ত করার সূচনা।
সরকার যখন শ্রমিকদের প্রকৃত সমস্যা ও ন্যায্য দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি কমিশনের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন দেশের স্বার্থে সব রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিপর্যস্ত বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে রাখা এখন আর নিছক কোনো বিকল্প নয়। এটি দেশের অর্থনৈতিক অস্তিত্ব, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা রক্ষার অন্যতম শেষ প্রতিরক্ষা প্রাচীর।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন