প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সউদী আরবের গভীরে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে হুথিরা, যারা দফায় দফায় ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল এবং ড্রোন ব্যবহার করছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী আনসারুল্লাহ, যাদের সাধারণত ‘হুথি’ নামে অভিহিত করা হয়, তারা চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সউদীর বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে একাধিকবার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।
গতকাল শনিবার বিমানবন্দরে এক হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। এটি গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সউদীতে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা। এই হামলার পর সউদী আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ফ্লাইট অপারেশন স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে এবং সমস্ত ফ্লাইট অন্যত্র ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের জন্য নতুন ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। হুথিরা এর আগে চলতি সপ্তাহে বিমানবন্দরটিতে আরও দুটি হামলার দায় স্বীকার করেছে এবং গত রবিবার এক সতর্কবার্তায় লোকজনকে সউদী বিমানবন্দরগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডার কতখানি উন্নত?
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রের প্রকৃতি এখনও পরিষ্কার নয়, তবে ২০১৫ সালে সউদী জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করার পর থেকে হুথিরা সউদীর দিকে শত শত ড্রোন ও মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। তাছাড়া, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় সংঘাত শুরুর পর থেকে এই ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি ইসরায়েল এবং ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজেও হামলা চালিয়ে আসছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হুথিরা একই কৌশল ব্যবহার করে আসছে। গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূল দখল করার আগে তারা সপ্তাহের পর সপ্তাহ সরকারি বাহিনীর অবস্থানে ড্রোন ও মিসাইলের বৃষ্টি চালিয়েছিল।
এই গোষ্ঠীর সবচেয়ে উন্নত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ‘ফিলিস্তিন-২’। এটি একটি দ্বি-পর্যায়ের সলিড ফুয়েল মিসাইল, যার আনুমানিক পাল্লা ২,০০০ কিলোমিটার এবং এটি সুপারসনিক ক্ষমতাসম্পন্ন। আরেকটি হলো ‘তুফান’, যা মূলত ইরানের গদর মিসাইলের একটি পরিবর্তিত রূপ। ধারণা করা হয়, এর পাল্লা ১,৩৫১ থেকে ১,৯৫০ কিলোমিটারের মধ্যে।
এই মিসাইলগুলোর পাল্লা এত বেশি যে—যার কিছু কিছু আবার ক্লাস্টার ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম—ইয়েমেন থেকে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও ভেদ করতে পেরেছে এগুলো। এছাড়াও হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডারে বুরকান এবং বদর সিরিজের মতো বেশ কিছু স্বল্পপাল্লার মিসাইল রয়েছে, যেগুলো ইয়েমেন থেকে সউদী আরবের অভ্যন্তরে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে।
কিংস কলেজ ওয়ার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ফেলো নাওয়াফ ওবায়েদের মতে, হুথিদের মিসাইল ভাণ্ডার মূলত ইরানি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, সাথে কিছু চিনা প্রভাবও রয়েছে।
তিনি বলেন, “হুথিরা উল্লেখযোগ্য কোনো দেশীয় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন করতে পেরেছে তার প্রমাণ খুব কমই রয়েছে। তাদের নিজস্ব সক্ষমতা মূলত নিম্নমানের কিছু মিসাইল এবং ড্রোন তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।” গত মাসে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী অভিযোগ করেছিল যে, নতুন ধরনের 'লোইটারিং ক্রুজ মিসাইল' তৈরিতে হুথিদের সহায়তা করছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
কেন হিমশিম খাচ্ছে সউদীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা?
সউদী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের বাহিনী গত সপ্তাহে রাজধানী লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক মিসাইলসহ বেশ কিছু প্রজেক্টাইল মাঝআকাশেই ভূপাতিত করেছে। কিন্তু শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে আঘাত হানা প্রজেক্টাইলটিকে তারা আটকাতে ব্যর্থ হয়। নাওয়াফ ওবায়েদ আল-জাজিরাকে জানান, সউদী আরবের বিশাল আয়তন এবং ইয়েমেনের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত বিবেচনা করলে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মাঝে মাঝে এমন ভেদ করার ঘটনা অপ্রত্যাশিত নয়।
তিনি বলেন, “আপনার কাছে যতই বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকুক না কেন, একটি না একটি মিসাইল ঠিকই ফাঁক গলে বেরিয়ে যাবে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রতিটি সফল হামলার বিপরীতে হুথিদের ডজন ডজন প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুসজতাই জানান, সউদী আরবের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল মূলত ইরান থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করা। তবে হুথিদের আক্রমণ বাড়তে থাকায় সউদীরা এখন তাদের এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অংশ ইয়েমেনের দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মিত্রদের মতো সউদী আরবও প্যাট্রিয়ট ও থাড যুদ্ধাস্ত্রের সীমিত মজুত নিয়ে লড়াই করছে। ইরানের সাথে যুদ্ধের মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এসব অস্ত্র দ্রুত খরচ করে ফেলেছিল। গত মাসে হুথিদের হামলা থেকে রক্ষা পেতে সউদী আরব বেশ কিছু বন্ধুভাবাপন্ন দেশের কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা অন্যান্য সহায়তার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল।
সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হুথিদের লড়াই
এদিকে হুথিরাও মারাত্মক কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। গোষ্ঠীটি জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা সউদী অবরোধের মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টেও তাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ওবায়েদ বলেন, “সামরিক দিক থেকে সউদী সমর্থিত জোটের অবস্থাই ওপরে রয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সউদী আরবের অভ্যন্তরে আকস্মিক কিছু হামলা চালিয়ে হুথিরা ঠিকই শিরোনাম দখল করতে সক্ষম হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক এবং জি২০ অর্থনীতির দেশ হিসেবে সউদী আরবের কিছু বৈশ্বিক দায়িত্ব রয়েছে, যার কারণে এই ধরনের হামলাগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান মনে হয়।”
হুথিদের মিসাইল ভাণ্ডারের সঠিক আকার অজানা, যা একই সাথে স্থলযুদ্ধে মিসাইল ব্যবহার এবং সউদীতে হামলা অব্যাহত রাখার তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ওবায়েদ জানান, ইয়েমেনে সউদী বিমান অভিযান হুথিদের মিসাইল ডিপো, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা এবং ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে মারাত্মকভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ফলে গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতার ওপর এটি ‘বিপুল ক্ষতি’ সাধন করছে বলে তিনি যোগ করেন।
বিশ্লেষক পুসজতাই আল-জাজিরাকে বলেন, হুথিদের হাতে সম্ভবত খুব সীমিত সংখ্যক স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল অবশিষ্ট রয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, সউদী আরবের মতো জায়গায় একসাথে একাধিক মিসাইল ও ড্রোন ছুড়ে বড় ধরনের 'স্যাচুরেশন অ্যাটাক' বা একযোগে তীব্র আক্রমণ চালানোর সামর্থ্য তাদের নেই।
এর পরিবর্তে তারা হয়তো কম সুরক্ষিত বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে এককভাবে মিসাইল নিক্ষেপের কৌশল বেছে নিতে পারে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো—“এই হামলার মাধ্যমে সর্বোচ্চ কৌশলগত প্রভাব ফেলা এবং বেসামরিক বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন