প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভবিষ্যতে যদি সিঙ্গাপুরে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে সেখানে উৎপাদিত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ভূগর্ভের গভীরে নিরাপদে সংরক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে। এ কথা একটি গবেষণায় উঠে এসেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ এবং সুইডেনের একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনও প্রযুক্তিগত বাধা এখনও শনাক্ত হয়নি।
গবেষণাটি মূলত বিদ্যমান তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত একটি ডেস্কটপ সমীক্ষা। তবে সিঙ্গাপুরের ভূতাত্ত্বিক পরিবেশের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য ভবিষ্যতে মাঠপর্যায়ের জরিপ ও অনুসন্ধান প্রয়োজন পড়বে বলে জানিয়েছে দেশটির জ্বালানি বাজার কর্তৃপক্ষ (ইএমএ)।
২০২৩ সালে ইএমএ ও জাতীয় পরিবেশ সংস্থা (এনইএ) সুইডেনভিত্তিক পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান এসকেবি ইন্টারন্যাশনালকে দায়িত্ব প্রদান করে, যাতে সিঙ্গাপুরে ঘনবসতিপূর্ণ ও ক্ষুদ্র আয়তনের দেশের প্রেক্ষাপটে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো মূল্যায়ন করা যায়।
গবেষণাটি ২০২৩ সালে সম্পন্ন হলেও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছিল ২০২৬ সালের মে মাসে। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুর সরকার জানায় যে, ২০২৭ সালে দেশটি জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মূল্যায়নের মুখোমুখি হবে। এই মূল্যায়নের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হবে যে, পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে সিঙ্গাপুর কতটা প্রস্তুত।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম প্রধান উপজাত হলো তেজস্ক্রিয় বর্জ্য। এতে এমন তেজস্ক্রিয় কণা থাকে, যা হাজার হাজার বছর পর্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় থাকতে পারে। সঠিক ব্যবস্থাপনা না করা হলে এগুলো মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ও ক্ষয়প্রক্রিয়ার সময়কাল অনুযায়ী পারমাণবিক বর্জ্য সাধারণত বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। নিম্নমাত্রার বর্জ্যের মধ্যে দূষিত গ্লাভস, পোশাক ও অন্যান্য সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত থাকে। অপরদিকে, উচ্চমাত্রার বর্জ্যের প্রধান উৎস হলো ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম জ্বালানি রড।
এই ব্যবহৃত জ্বালানি রডে থাকা প্লুটোনিয়াম-২৩৯-এর মতো উপাদান তেজস্ক্রিয়তা কমাতে প্রায় দুই লাখ ৪০ হাজার বছর সময় নেয়। ফলে এগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এক সময় মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা পারমাণবিক বর্জ্য মহাকাশে পাঠিয়ে দেওয়ার ধারণা বিবেচনা করেছিল। কিন্তু বিপুল ব্যয় এবং উৎক্ষেপণ ব্যর্থতার ঝুঁকির কারণে সে পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।
বর্তমানে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোতে ব্যবহৃত জ্বালানি রড প্রথমে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিশেষ পানির পুলে ঠান্ডা করা হয় অথবা সুরক্ষিত কনটেইনারে সংরক্ষণ করা হয়। পরে এগুলোকে গভীর ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগারে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়।
এসব স্থাপনার নাম ডিপ জিওলজিক্যাল রিপোজিটরি বা গভীর ভূতাত্ত্বিক সংরক্ষণাগার। সাধারণত ভূপৃষ্ঠের ৪০০ থেকে ৮০০ মিটার নিচে নির্মিত টানেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব স্থাপনা গড়ে তোলা হয়, যার উদ্দেশ্য হলো তেজস্ক্রিয় পদার্থ হাজার হাজার বছর ধরে জীবজগত থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা।
বর্তমানে ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও ফ্রান্সসহ বেশ কয়েকটি দেশ এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বা অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ফিনল্যান্ডই একমাত্র দেশ যারা সম্পূর্ণরূপে একটি স্থাপনা নির্মাণ করেছে। দেশটির ‘অনকালো’ নামের ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগারের কার্যক্রম ২০২৬ সালের শেষের দিকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
অনকালো প্রকল্পের প্রযুক্তির উন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়েছে এসকেবি ইন্টারন্যাশনাল।
ইএমএ’র ভাষ্য অনুযায়ী, গবেষণায় সিঙ্গাপুরের জন্য সম্ভাব্য বিভিন্ন ধরনের গভীর ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণ পদ্ধতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা যায়, কোনও বিকল্পই প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব নয়।
সংস্থাটি বলেছে, “সিঙ্গাপুরে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য পদ্ধতিগুলোর ক্ষেত্রে কোনও মৌলিক প্রযুক্তিগত বাধা পাওয়া যায়নি। এমনকি উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণও ছোট একটি দেশের জন্য অপ্রতিরোধ্য হবে না।”
একটি ১ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরে প্রায় সাত লাখ পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করতে পারে। এমন একটি কেন্দ্র বছরে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার লিটার পারমাণবিক বর্জ্য উৎপাদন করতে সক্ষম, যা একটি অলিম্পিক মানের সুইমিংপুলের প্রায় সাত ভাগের এক ভাগ জায়গা পূরণ করতে পারে।
এর মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ উচ্চমাত্রার বর্জ্য, যা মূলত ব্যবহৃত জ্বালানি। তুলনামূলকভাবে, সিঙ্গাপুরের সেমাকাউ ল্যান্ডফিলের ধারণক্ষমতা ১১ হাজারেরও বেশি অলিম্পিক মানের সুইমিংপুলের সমান।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ব্যবহৃত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিগুলো ক্ষুদ্র মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর)-এর ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে।
সিঙ্গাপুর বর্তমানে এ ধরনের উন্নত ও তুলনামূলক নিরাপদ প্রযুক্তির ওপর বিশেষ নজর রাখছে। সাধারণত একটি ক্ষুদ্র মডুলার রিঅ্যাক্টরের উৎপাদনক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রচলিত ১ গিগাওয়াট কেন্দ্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
ইএমএ জানিয়েছে, সঠিক বিকিরণ প্রতিরোধ ও সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি অত্যন্ত কম পর্যায়ে রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিঙ্গাপুরের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বিস্তৃত গ্রানাইট শিলাস্তর ব্যবহৃত জ্বালানি ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত হতে পারে।
সিঙ্গাপুরে বুকিত তিমাহ গ্রানাইট নামে পরিচিত শিলাস্তর উডল্যান্ডস, সেমবাওয়াং, বুকিত বাতক ও মধ্যাঞ্চলে বিস্তৃত। এছাড়া পুলাউ উবিন দ্বীপেও গ্রানাইট রয়েছে।
তবে শিলাগুলোতে বড় ধরনের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক ফল্ট থাকা যাবে না। কারণ এসব ফাটলের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি প্রবাহিত হলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্য একটি বিকল্প হিসেবে পাঁচ কিলোমিটার গভীর বোরহোল প্রযুক্তি বিবেচনা করা যেতে পারে। সিঙ্গাপুরের সীমিত ভূমির কারণে ঐতিহ্যগত টানেলভিত্তিক সংরক্ষণাগারের পরিবর্তে এই পদ্ধতি ব্যবহার সম্ভব।
এই পদ্ধতিতে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার গভীর সরু গর্ত খনন করা হয় এবং নিচের অংশে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য রাখা হয়। এরপর বেন্টোনাইট মাটি, সিমেন্ট ও অ্যাসফল্ট দিয়ে গর্ত সিল করে দেওয়া হয়, ফলে বর্জ্য পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে জনসাধারণের আস্থা অর্জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিঙ্গাপুরের বিশেষ ভৌগোলিক বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে জনগণকে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পৃক্ত রাখতে হবে।
প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এইচওয়াই-এর পারমাণবিক কৌশল বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ চিউ বলেন, ফিনল্যান্ডের অনকালো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় চার দশক সময় লেগেছে। উপযুক্ত স্থান নির্বাচনেই প্রায় ২০ বছর সময় ব্যয় হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, “সিঙ্গাপুরের বিশেষ ভৌগোলিক বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে জনগণকে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। ভূগর্ভস্থ বর্জ্য সংরক্ষণের বিষয় আলোচনা শুরু করার আগে পারমাণবিক শক্তি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে যদি এমন কোনও স্থাপনা নির্মাণ করা হয়, তাহলে তা আবাসিক এলাকা থেকে দূরে, কম জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল বা উপযুক্ত উপকূলীয় দ্বীপে স্থাপন করা হতে পারে। সিঙ্গাপুর সরকার জানিয়েছে, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে যেন দেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও উপযোগী সমাধান নির্ধারণ করা যায়। সূত্র: স্ট্রেইটস টাইমস
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন