প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিবিসির বিতর্কিত তথ্যচিত্র ‘গাজা : হাউ টু সার্ভাইভ আ ওয়ারজোন’-এ উঠে আসা গল্পগুলো এখনো প্রচার হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ছবিটির সহ-পরিচালক জেমি রবার্টস। তবে তথ্যচিত্রটি তৈরির সময় গুরুতর একটি ভুল হয়েছিল বলে তিনি স্বীকার করেছেন।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তথ্যচিত্রটি বিবিসির অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর এটি ছিল নির্মাতা রবার্টসের প্রথম সাক্ষাৎকার। তথ্যচিত্রটি সরিয়ে নেওয়ার কারণ ছিল, এতে বর্ণনাকারী হিসেবে থাকা ১৩ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি ছেলে আবদুল্লাহর বাবা হামাসের একজন কর্মকর্তা। বিতর্কের জন্য নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান হোয়ো ফিল্মসের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেছেন রবার্টস। তিনি বলেন, "এই ঘটনায় অনেক মানুষ কষ্ট পেয়েছেন এবং এর জন্য আমি দুঃখিত।" নতুন তথ্যচিত্র ইংল্যান্ড ‘টিল আই ডাই’ নিয়ে কথা বলার সময় তিনি এসব মন্তব্য করেন। নতুন ছবিটি যুক্তরাজ্যে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন নিয়ে তৈরি। বাফটা ও এমি পুরস্কারজয়ী এই নির্মাতা বলেন, গাজার তথ্যচিত্র তৈরির ভুল থেকে হোয়ো ফিল্মস শিক্ষা নিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য তাদের সম্পাদকীয় কাজের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
‘গাজা : হাউ টু সার্ভাইভ আ ওয়ারজোন’ গত ফেব্রুয়ারিতে প্রচার করা হয়। এতে ১৩ বছর বয়সী আবদুল্লাহ বর্ণনাকারীর ভূমিকা পালন করে। সে গাজার একটি কথিত ‘নিরাপদ এলাকায়’ বসবাসকারী চারজন অংশগ্রহণকারীর একজন ছিল। পরে আবদুল্লাহর বাবার চাকরি সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ্যে আসে। জানা যায়, তিনি হামাসের সঙ্গে যুক্ত একটি পদে ছিলেন। এরপর তথ্যচিত্রটি বিবিসির অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে পুরো বিষয়টি পর্যালোচনার নির্দেশ দেয় বিবিসি। গত জুলাইয়ে সেই পর্যালোচনার ফল প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, তথ্যচিত্রটি বিবিসির সঠিক তথ্য দেওয়ার নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে। তবে পর্যালোচনায় বলা হয়, আবদুল্লাহর বাবার পদ সম্পর্কে হোয়ো ফিল্মস বিবিসিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করেনি। প্রতিষ্ঠানটি মনে করেছিল, তার বাবার পদটি বেসামরিক বা কারিগরি ধরনের।
তবে গুরুত্বপূর্ণ এই তথ্যটি বিবিসিকে জানানো হয়নি। এ কারণে তথ্যচিত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় হোয়োর ভুল ছিল বলে পর্যালোচনায় উঠে আসে। একই সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর না রাখার জন্য বিবিসিরও দায় রয়েছে বলে পর্যালোচনায় বলা হয়। এরপর বিবিসি ও হোয়ো- দুই পক্ষই ক্ষমা চায়। বিবিসির চেয়ারম্যান সামির শাহ ঘটনাটিকে প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থার জন্য ‘হৃদয়ে ছুরিকাঘাতের’ মতো বলে বর্ণনা করেন। রবার্টসও ভুলের দায় স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, "তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের একটি বড় ঘাটতি ছিল।" এর জন্য তিনি ক্ষমাও চেয়েছেন। ভবিষ্যতে এমন ভুল এড়াতে তাদের প্রতিষ্ঠান এখন আরো কঠোরভাবে সম্পাদকীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে বলে জানান তিনি। রবার্টস বলেন, অভিজ্ঞ আইন ও সম্পাদকীয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তারা কাজ করছেন। এসব বিশেষজ্ঞ তাদের কাজ নির্ধারিত মান অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে সহায়তা করছেন।
তথ্যচিত্রটি এখনো যুক্তরাজ্যে প্রচার করা হচ্ছে না। বিবিসি এটি আবার প্রচার না করার সিদ্ধান্তে রয়েছে। রবার্টস বলেন, তথ্যচিত্র তৈরির ক্ষেত্রে ভুলটি গুরুতর ছিল। তবে তার মতে, ছবিটিতে যেসব মানুষের গল্প তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং সেগুলো দর্শকদের সামনে আসা উচিত। তিনি বলেন, "ওই তথ্যচিত্রে সংঘাতের মধ্যে থাকা শিশুদের জীবন তুলে ধরা হয়েছে।" রবার্টস বলেন, "আমরা যে ভুল করেছি, সেটি গুরুতর ছিল। এ নিয়ে আমরা বিবিসির পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে গিয়েছি এবং বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছি।" তার মতে, তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া মানুষগুলোর ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সংঘাত বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্পর্ক ছিল না। বরং সংঘাতের মধ্যে তাদের জীবনই ছিল তথ্যচিত্রটির মূল বিষয়। রবার্টস বলেন, "আমি চাই, কোনো একসময় তাদের গল্পগুলো বলা হোক। তবে এর মধ্যে পরিস্থিতি অনেক দূর এগিয়ে গেছে।"
গাজার তথ্যচিত্রের পর হোয়ো ফিল্মসের প্রথম বড় প্রকল্পও একটি বিতর্কিত বিষয়কে কেন্দ্র করে। ‘ইংল্যান্ড ‘টিল আই ডাই’ তথ্যচিত্রে রবার্টস যুক্তরাজ্যের অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের সমর্থকদের অনুসরণ করেছেন। দেশটির বিভিন্ন শহরে তাদের বিক্ষোভ, ভয় দেখানো এবং সহিংসতার ঘটনাও ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। এর ১১ বছর আগে ডানপন্থী চরমপন্থীদের নিয়ে ‘অ্যাংরি, হোয়াইট অ্যান্ড প্রাউড’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন রবার্টস। নতুন তথ্যচিত্রে গত আগস্ট থেকে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের উত্থানকে একজন ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়েছে। ওই ব্যক্তির নাম লিয়াম। লিয়াম পূর্ব সাসেক্সের ক্রোবোরো শহরে নিজের বাড়ির কাছে একটি সাবেক সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার বিরোধিতা করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
রবার্টস বলেন, "ইংল্যান্ড ‘টিল আই ডাই’ তথ্যচিত্রের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, কেন অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন নিয়ে পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।" বিশেষ করে মুখ ঢাকা ডানপন্থী চরমপন্থীদের বিক্ষোভ বাড়ার পর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়েছে বলে তিনি জানান। রবার্টস বলেন, পুলিশ, পুলিশ ও অপরাধবিষয়ক কমিশনার এবং সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা পরিস্থিতি দেখে বিস্মিত হয়েছেন। তারা বুঝতে চাইছেন, কীভাবে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হলো। তবে তার তথ্যচিত্রে এর পেছনের আরেকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। রবার্টসের মতে, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যথেষ্ট যোগাযোগ করা হয়নি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষকে প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেওয়া হয়নি।
এর ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, ডানপন্থী চরমপন্থীরা সেই পরিস্থিতির সুযোগ নেয় বলে মনে করেন তিনি। রবার্টস বলেন, ক্রোবোরোর অনেক বাসিন্দার উদ্বেগ পুরোপুরি অযৌক্তিক ছিল না। তিনি বলেন, "তাদের উদ্বেগের একটি কারণ ছিল শহরে ৬০০ পুরুষকে নিয়ে আসা হচ্ছে। তারা চিন্তিত ছিলেন।" তবে এসব উদ্বেগ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা যথেষ্ট সহায়তা পাননি বলে মনে করেছিলেন। রবার্টসের ভাষ্য, এর ফলে অপারেশন রেইজ দ্য কালারসের মতো জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো যখন শহরে আসে, তখন স্থানীয় বাসিন্দারা বাইরের বিভিন্ন বার্তার প্রভাব নেওয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ক্রোবোরোতে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও ক্যামেরায় ধারণ করেন রবার্টস। আন্দোলনের নেতা লিয়াম কী ভাবছেন, তা বোঝার জন্য পুরো সময় তাকে কঠোরভাবে প্রশ্ন করেছেন বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্দোলনকারী গোষ্ঠী কী বলছে এবং বাস্তবে কী করছে- দুটির মধ্যে পার্থক্যও খুঁজে দেখেছেন রবার্টস। তথ্যচিত্রে এমন ঘটনাও উঠে এসেছে, যেখানে আন্দোলনকারী গোষ্ঠী দাবি করেছিল, তারা নারীদের নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করছে। কিন্তু পরে ভিন্নমত পোষণকারী নারীদেরই ভয় দেখানোর ঘটনা দেখা যায়। রবার্টস বলেন, পরিস্থিতিতে উত্তেজনার মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। মানুষের আচরণও গ্রহণযোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, "এখন আর মানুষ শুধু প্রশ্ন তুলছে না বা নিজেদের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করতে চাইছে না। বিষয়টি অন্য কিছুর দিকে চলে যাচ্ছে।" তার মতে, স্থানীয় মানুষের প্রকৃত উদ্বেগ, সরকারি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তার সমন্বয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন