প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের বিভিন্ন স্থানে তরুণদের মধ্যে একটি উত্তাল আন্দোলন চলছে। অভিযোগ উঠেছে যে নির্বাচন কমিশন বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (Special Intensive Revision) বা সংক্ষেপে এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দিয়েছে। বাদ পড়া জনগণের মধ্যে প্রধানত মুসলিম, স্থানান্তরিত মানুষ, দলিত, নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী রয়েছে। আন্দোলনটি দিল্লির যন্তর-মন্তর থেকে পশ্চিমবঙ্গ, কর্ণাটকসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে আন্দোলনের মূল দাবি হচ্ছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। অক্টোবর মাসে এই আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে জেনজি, ককরোচ জনতা পার্টি, বিরোধী দলগুলোর জোট বা ইন্ডিয়া ব্লক। আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে বর্তমানে নিখিল ভারত ছাত্র সমিতি বা আইসার সভাপতি ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা রয়েছেন। এসআইআর-এর বিরুদ্ধে নারী অধিকার সংগঠনগুলোও সোচ্চারভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। কারণ, এসআইআর সরাসরি নারী, বিশেষ করে মুসলিম এবং প্রান্তিক নারীদের ভোটের অধিকার এবং নাগরিকত্বকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। বাদ পড়া ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে নারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যার মধ্যে ৬২ শতাংশ নারী। একইভাবে উত্তরপ্রদেশ, বিহারে নারী ভোটার বাদ পড়ার হার ৬০ শতাংশ, আসামে ৭০ শতাংশ।
যদিও এসআইআর-এর উদ্দেশ্য হিসেবে অনুপযুক্ত এবং ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশন কাদের ‘অনুপযুক্ত’ বলে চিহ্নিত করেছে, তা দেখলে উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা তৈরি হয়। নারীবিরোধী আচরণ এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জনগণ এই বিষয়টি বুঝতে পেরে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছে। বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে বিহারে এসআইআর হওয়ার পর ৬৫ লাখ নাম বাদ পড়েছিল, যার মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ। নারী-পুরুষ অনুপাত প্রতি হাজার পুরুষের ৮৯২ নারী হয়ে যায়, যা আগে ছিল প্রতি হাজার পুরুষে ৯০৭ নারী। গুজরাটে নারী-পুরুষ অনুপাত ৯৩৮, মধ্যপ্রদেশে ৯৩৪ এবং রাজস্থানে ৯২০ নারীতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১২টি রাজ্যে নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি বাদ পড়েছেন, ফলে নারী-পুরুষ ভোটারের অনুপাতও কমে গেছে।
নারীদের বাদ দেওয়ার কারণ বৈষম্যমূলক এবং যে প্রক্রিয়ায় এটি করা হয়েছে, তাতে এই বৈষম্যের প্রকাশ স্পষ্ট। বিবাহিত নারীদের বাবা-মায়ের নাম ছাড়াও তাদের বাপের বাড়ির ঠিকানা যাচাই করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটি প্রান্তিক নারীদের জন্য অনেক কঠিন। শ্রমজীবী নারীদের নিজস্ব স্থায়ী নথিপত্র দেখাতে বলা হচ্ছে এবং না দিতে পারলে বাদ দেওয়া হচ্ছে। নারীবাদী নেটওয়ার্ক, বিশেষ করে অল-ইন্ডিয়া ফেমিনিস্ট অ্যালায়েন্স (ALIFA-NAPM) এই নথিপত্র চাওয়ার বিষয়টিকে পিতৃতান্ত্রিক বংশধারা অনুসরণ করছে বলে অভিযোগ করেছে, যা মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বিবাহিত, প্রান্তিক এবং মাইগ্রেন্ট নারীকে বৈষম্যের মধ্যে ফেলে।
বিবাহিত নারীদের সমস্যা প্রান্তিক জনগণের মধ্যে অনেক জটিল। বিয়ের পর তাদের নামের পদবি পরিবর্তন হয়ে যায় এবং ঠিকানা বদলে যায়। সবকিছু স্বামীর নাম ও ঠিকানার সঙ্গে যুক্ত থাকে। যারা গরিব এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তাদের জন্মনিবন্ধন খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ভারতের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকায় নাম রাখতে গিয়ে বাবার বাড়ির নথিপত্র দিতে বাধ্য করা নারীদের বাদ দেওয়ার ইচ্ছাকেই প্রতিফলিত করে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিশেষ বাংলাদেশের মানুষ বলেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অজুহাত দেওয়া হয়।
যারা নারীরা বাদ পড়ছেন, তারা অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল, শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে আছেন এবং তাদের সরকারের প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। এদের মধ্যে অধিকাংশ আদিবাসী, দলিত এবং শ্রমজীবী নারী। এই জনগণের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অর্থ হচ্ছে তাদের প্রতিনিধিত্ব নির্বাচিত করার পথ বন্ধ করে দেওয়া। নারীদের ভোটাধিকার হরণ ছাড়াও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই নারীরা সোচ্চার হয়েছেন। ঠিক যেমন নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন বা Citizen Amendment Act CAA এবং জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (National Register of Citizens NRC) নিয়ে হাজার হাজার আন্দোলনে তীব্র শীতের মধ্যে রাস্তায় বসে প্রতিবাদ করেছেন। ২০১৯ সালের ওই আন্দোলন সাধারণ নারীদের নেতৃত্বে হয়েছিল। শিক্ষক, ছাত্রী, গৃহিণী, তরুণ এবং বৃদ্ধ নারীরা এক হয়ে গিয়েছিলেন। ধর্মীয় পরিচয়ে অধিকাংশ ছিলেন মুসলমান। আন্দোলন ছিল অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ। তারা শুধু রাস্তায় বসে থাকেননি, বাড়ি বাড়ি গিয়েও প্রচার চালিয়ে ছিলেন। আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিল দিল্লির শাহীনবাগ, যেখানে টানা ১০০ দিন তীব্র শীতের মধ্যেও ধর্মঘট পালন করেছিলেন। আন্দোলনে নেতৃত্বে যেমন তরুণ নারী ছিলেন, তেমনি ৮২ বছর বয়সি বিলকিস বানু বা বিলকিস দাদির মতো প্রবীণ নারীরাও ছিলেন। ভারত এই আন্দোলন নিয়ে যথেষ্ট বিপাকে পড়েছিল, তবে ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি ও লকডাউনের কারণে আন্দোলনটি সমাপ্ত হয়েছিল। জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার জন্য পুরো এলাকাটি ফাঁকা করে দেওয়া হয়।
ভারতে নারীরা যখন রাজনীতিতে নিজেদের যোগ্যতায় এগিয়ে আসছেন, তখন নারীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার এই ঘটনা ঘটে গেছে এবং এটি একবিংশ শতাব্দীর প্রথম অংশেই ঘটেছে। এখন নারী আন্দোলন ভোটার তালিকার বিষয়টির সংস্কার দাবি করছে। তারা দাবি করছে, যেসব কারণে নারী ভোটারদের নাম অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাদ পড়েছে, তা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে বাদ পড়া ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা। প্রান্তিক নারীদের যেসব নথি চাওয়া হয়েছে, অথচ তারা সেগুলো দিতে পারছে না, তার বাস্তব কারণ রয়েছে। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের আইনি অস্তিত্ব প্রমাণের নথি সহজে পাওয়া যায় না। তাদের জন্য বিকল্প পদ্ধতিতে নথিভুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। শুধু তাই নয়, ট্রান্সজেন্ডার এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের আইডি কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে এই এসআইআর শুধু ভোটের অধিকার হরণ মনে হলেও এর পরিণাম আরো সুদূরপ্রসারী। সরকারের কাছে সুবিধা পেতে হলে ভোটার আইডি কিংবা নাগরিকত্বের প্রমাণ প্রয়োজন। নারীদের ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিধবা ভাতা বা রেশন সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হতে পারে। তাদের ভারতের নাগরিক নয় বলে অন্য দেশে পাঠিয়ে দিতে পারে। মুসলমান এবং বাংলাভাষী হলে তাদের জন্য ঝুঁকি আরো অনেক বেশি।
এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা নারীদের এবং প্রান্তিক মানুষকে নিশ্চিহ্ন করার নগ্ন চেষ্টা। প্রতিরোধকারীদের জয় হোক।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন