প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
স্পেন থেকে অভিবাসীদের প্রবেশ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ইতালি সাময়িকভাবে স্পেনের সঙ্গে ‘শেনজেন চুক্তি’র আওতায় অবাধ চলাচল এক মাসের জন্য স্থগিত করেছে। মরক্কোর ভূখণ্ডে অবস্থিত স্পেনের ছিটমহল সিউটার একটি দিনে প্রায় ৪৯ হাজার অভিবাসীর প্রবেশের ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ইতালি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এ সময়, স্পেন থেকে ইতালিতে প্রবেশকারী ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের নাগরিকদের জন্য বন্দরে ও বিমানবন্দরে সীমান্ত তল্লাশি এবং নথিপত্র যাচাই করা হবে। তবে এই ব্যবস্থা স্পেন বা অন্য ইইউ দেশের নাগরিকদের জন্য নয়, বরং মূলত তৃতীয় দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
ইতালির অভিবাসন বিশ্লেষণ ও সীমান্ত নিরাপত্তা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে, শুক্রবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠকে স্পেনের সঙ্গে শেনজেনের অবাধ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিতের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৩১ জুন) সন্ধ্যায় ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, উপ-প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি এবং মাত্তেও সালভিনি এ সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্পেন থেকে আসা যাত্রীদের জন্য নতুন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা জারি করেছে।
উপ-প্রধানমন্ত্রী তাজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইউরোপের সীমান্ত রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ তার ভাষায়, শেনজেন চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী এটি একটি বৈধ ও সাময়িক ব্যবস্থা, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
তিনি আরো বলেন, সিউটায় অভিবাসী সংকট দেখিয়েছে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত রক্ষা শুধু একটি দেশের নয়, বরং সব সদস্য দেশের যৌথ দায়িত্ব। অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ঠেকাতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি এ থেকে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হুমকিও মোকাবিলা করতে হবে।
এতে উল্লেখযোগ্য যে, এর আগে হাজার হাজার অভিবাসী প্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভিসামুক্ত ‘শেনজেন অঞ্চল’ থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলমান।
যদি প্রয়োজন পড়ে, তবে স্পেনের বিরুদ্ধে শেনজেন চুক্তি স্থগিতের মতো ‘ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা’ গ্রহণ করা হতে পারে।
মেলোনি উল্লেখ করেন যে, সিউটা থেকে আসা দৃশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নিয়ন্ত্রণহীন অবৈধ অভিবাসন ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য বাস্তব হুমকি। তিনি বললেন, এ পরিস্থিতিতে ইতালি একটি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না।
শেনজেন চুক্তি হলো ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক চুক্তি, যার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক অভ্যন্তরীণ সীমানা বা চেকপোস্ট উঠে গিয়েছে এবং এক ভিসায় একাধিক দেশে অবাধ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই চুক্তির ফলে গঠিত শেনজেন এলাকায় মানুষ বিনা বাধায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করতে সক্ষম হন।
শেনজেন অঞ্চল ইউরোপের ২৯টি দেশের একটি উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সাধারণত পাসপোর্ট বা সীমান্ত তল্লাশি ছাড়াই অবাধে চলাচল করা যায়।
স্পেন ইতালির এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেজ ব্যাখ্যা চেয়ে মাদ্রিদে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছেন।
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, সিউটার অভিবাসী সংকটের সঙ্গে সরকারের অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তারা দাবি করে, সাঁতার কেটে সিউটায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় মানবপাচারকারী ও অপরাধী চক্র দ্বারা অপব্যবহারের ফলস্বরূপ এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, ফ্রান্সও স্পেনের সঙ্গে স্থল সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেছেন, সিউটার অভিবাসী সংকট মোকাবিলায় ফ্রান্স স্পেনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে। তবে ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, চেক প্রজাতন্ত্র ও সুইডেনসহ কয়েকটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ইতালির অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে।
ফিনল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারি রান্তানেন বলেছেন, স্পেন শেনজেন অঞ্চলের বাইরের সীমান্ত রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে এবং এই পরিস্থিতি আর চলতে পারে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্র বিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার বলেছেন, সিউটার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও সেখান থেকে ইউরোপের মূল ভূখণ্ড বা অন্য সদস্য দেশে অভিবাসীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের কোনো তথ্য নেই। তিনি জানান, স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, শেনজেন সীমান্ত আইনে সিউটা ও মেলিলার জন্য বিশেষ নিয়ম রয়েছে। তাই সিউটা থেকে বের হওয়া ব্যক্তিদের ওপর আগে থেকেই সীমান্ত তল্লাশি চলমান রয়েছে।
এদিকে আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতালিতে শেনজেন চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইতালির পদক্ষেপকে ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি, জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) এবং যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে-সহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি কট্টর ডানপন্থী দল সমর্থন জানিয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন