প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিদেশ সফরের প্রকৃত সাফল্য দেশে ফিরে আসার দিন নির্ধারিত হয় না। আসল বিচারক হল সময়। কোনো সফরের মূল্য কেবল কতগুলি চুক্তি হলো, কতটি সমঝোতা স্মারক সই হলো বা কতটি ঘোষণা এলো, এসব বিষয় নিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
কূটনীতির অনেক অর্জন দৃশ্যমান হতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। কখনও তা বাণিজ্যে প্রতিফলিত হয়, কখনও বিনিয়োগে, আবার কখনও আন্তর্জাতিক আস্থায়, অথবা একটি দেশের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গেও তা প্রকাশ পায়।
এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া নিছক একটি কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি স্পষ্ট দর্শনের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। এই দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তা নতুন বাস্তবতার মধ্যে প্রসারিত করেছিলেন। আর আজকের পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে তারেক রহমান সেই ধারাবাহিকতাকে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন, এমন প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে।
অনেকে প্রশ্ন করছেন, প্রথম বিদেশ সফরের জন্য কেন চীন ও মালয়েশিয়া? কেন অন্য কোনো দেশ নয়? এর উত্তর জানতে হলে কয়েক দশক পেছনে ফিরে দেখতে হবে।
স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতি ছিল দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত। সেই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল না রেখে বহুমাত্রিক করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর কূটনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ যেখানে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত হবে, সেখানেই সম্পর্ক আরও গভীর করা। এর অংশ হিসেবেই চীন সঙ্গে সম্পর্ক নতুন গতি পায়। একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
মালয়েশিয়া তখন দ্রুত শিল্পায়নের পথে এগোচ্ছে। চীনও ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট জিয়া হয়তো আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতির চিত্র দেখেননি। তবে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে কেবল রাজনৈতিক বন্ধুত্ব নয়, বরং অর্থনৈতিক অংশীদারও খুঁজতে হবে।
খালেদা জিয়ার সময় সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপরদিকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজারে পরিণত হয়। হাজার হাজার বাংলাদেশির কর্মসংস্থান দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়। নতুন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রও উন্মুক্ত হতে থাকে।
এই ধারাবাহিকতায় এসেছে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফর। তবে এটিকে কেবল অতীতের পুনরাবৃত্তি বললে ভুল হবে। কারণ, বিশ্ব এখন অনেক বদলে গেছে।
আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতা কেবল কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিল্প, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দক্ষ জনশক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়েও। ফলে বাংলাদেশের কূটনীতিকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।
এ কারণে চীন সফরের গুরুত্ব কেবল নতুন সহযোগিতা ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় তাৎপর্য হলো—বাংলাদেশ নিজেকে কেবল উন্নয়ন সহায়তা গ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। যদি এই প্রচেষ্টা বাস্তবে রূপ পায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে নিম্নমূল্যের শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে উচ্চমূল্যের শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
একইভাবে মালয়েশিয়া সফরের তাৎপর্যও কেবল শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধ নয়। বহু বছর ধরে দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল কর্মী পাঠানো। কিন্তু বর্তমানে আলোচনা দক্ষ মানবসম্পদ, বিনিয়োগ, কৃষি, হালাল শিল্প, প্রযুক্তি এবং শিল্প সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের চরিত্র পরিবর্তন হতে পারে।
এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির ভাষা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অতীতে উন্নয়ন সহযোগিতা বা অবকাঠামো নির্মাণ ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এখন বিনিয়োগ, বাজার, প্রযুক্তি, শিল্প স্থানান্তর এবং উৎপাদন বিষয়গুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তন কেবল শব্দের পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনৈতিক কৌশলেরও পরিবর্তন।
এমন অনেকেই বিদেশ সফরের মূল্যায়ন করেন কতটি চুক্তি হলো, কত ডলারের প্রতিশ্রুতি এল বা কতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো, সেগুলো দিয়ে। কিন্তু কূটনীতির ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। অনেক বড় ঘোষণাও বাস্তবায়নের অভাবে ইতিহাসে হারিয়ে গেছে। আবার অনেক ছোট উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে একটি দেশের অর্থনীতিকে পরিবর্তন করেছে। তাই সফরের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে ঘোষণার ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের ওপর।
চীন ও মালয়েশিয়া, দুটি দেশই বাংলাদেশের জন্য কেবল বন্ধু রাষ্ট্র নয়; তারা অর্থনৈতিক রূপান্তরের সম্ভাব্য অংশীদার। একটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনশীল অর্থনীতি, অন্যটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সফল শিল্পোন্নত রাষ্ট্র। বাংলাদেশের সামনে যখন মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়িয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ মুখোমুখি, তখন এই দুই দেশের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা দিচ্ছে।
তবে এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রেখে যায়। এই সফর কি ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেবে? এর উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ইতিহাস তাৎক্ষণিক রায় দেয় না।
জিয়াউর রহমান যে বহুমাত্রিক কূটনীতির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং খালেদা জিয়া যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করেছিলেন, তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফর সেই ধারাবাহিকতাকে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা দেওয়ার একটি প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বাস্তবায়নের অগ্রগতির ভিত্তিতে।
তবে চীন ও মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবায়নে পরিণত হবে, তা নির্ভর করবে প্রতিশ্রুত উদ্যোগের বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের প্রবাহ, বাণিজ্যের বিস্তার, প্রযুক্তি সহযোগিতার অগ্রগতি এবং দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যায়, তার ওপর।
চীন ও মালয়েশিয়া সফরকে তাই কেবল একটি কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে নতুন বাস্তবতায় অভিযোজিত করার একটি প্রয়াস। জিয়া পরিবারের বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতার নতুন অধ্যায়। এখন প্রয়োজন ঘোষণাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। কারণ কূটনীতির সাফল্য শুধুমাত্র ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন