প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সশস্ত্র মাওবাদী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের দাবি করলেও ‘মতাদর্শগত নকশালবাদ’ এখনও ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ খুঁজে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভারতের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে, দেশের রাজধানী নয়াদিল্লির পুরোনো দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেওয়া একটি ভাষণে তিনি ‘দিমাগি নকশাল’দের চিহ্নিত করে সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন।
তার অভিযোগ, সশস্ত্র নকশালদের একাংশ নির্মূল হলেও মাওবাদী মানসিকতার কিছু মানুষ এখনও সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। তারা হিংসা, অশান্তি এবং সামাজিক বিভাজন তৈরির চেষ্টা করতে পারে।
নকশাল ও মাওবাদী হলো ভারতের চরম বামপন্থী সশস্ত্র রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আন্দোলন। ১৯৬৭ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামে কৃষক বিদ্রোহের মাধ্যমে এই সশস্ত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এই আন্দোলনের সদস্যরা চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবী, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং আধুনিক গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সে-তুং-এর সাম্যবাদী এবং সশস্ত্র বিপ্লবের নীতিতে শর্তহীনভাবে বিশ্বাসী।
তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংবিধানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্য ছিল। ভারতের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জঙ্গল এবং অনুন্নত আদিবাসী এলাকায় যেমন ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ডে তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করেছিল। সেইসাথে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত ছিল।
লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, একসময় দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মাওবাদী হিংসার প্রভাব ছিল। বন্দুকের মাধ্যমে সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।
তার দাবি, ২০১৪ সালের পর থেকে নকশালমুক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্যে সরকার ধারাবাহিক অভিযান এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের ফলে সাফল্য অর্জন করেছে। যে এলাকাগুলিতে কখনও নকশালদের বন্দুকের আওয়াজ শোনা যেত, সেগুলি এখন উন্নয়ন, আস্থাশীলতা ও সরকারি উদ্যোগের নতুন পরিবেশে রূপান্তরিত হয়েছে বলেও দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে সশস্ত্র মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযানের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মোদী এবার মতাদর্শগত লড়াইয়ের উপরও জোর দিয়েছেন। তিনি জানান, জঙ্গলে অস্ত্র হাতে থাকা নকশালদের অনেকাংশেই নিষ্ক্রিয় করা গেলেও ‘দিমাগি নকশাল’রা এখনও সক্রিয়। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন কৌশলে মানুষকে প্রভাবিত করে সমাজে বিভাজন তৈরি করতে চাইতে পারে এবং সুযোগ পেলে তারা আবার হিংসার পথ বেছে নেবে এমন সতর্কবার্তাও দেন প্রধানমন্ত্রী।
এই ধরনের মানসিকতা বিরোধী মানুষের চিহ্নিতকরণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মোদীর বক্তব্যে উঠে আসে নকশাল মতাদর্শের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের অভিযোগও। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে মাওবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। নীতিনির্ধারণ ও বিভিন্ন উদ্যোগেও সেই মতাদর্শের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। ফলে, নকশালবাদের বিরুদ্ধে সরকারের লড়াই শুধুমাত্র সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযানেই সীমাবদ্ধ নয়, মতাদর্শগত প্রভাবের মোকাবিলাও এই লড়াইয়ের একটি অংশ- প্রধানমন্ত্রী এমন ইঙ্গিত করেন।
‘দিমাগি নকশাল’ এই শব্দবন্ধ ব্যবহারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, সরকারের সমালোচকদের নিশানা করতেই নতুন এই তকমা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা পি চিদাম্বরম পাল্টা কটাক্ষ করেছেন, তিনি নিজেকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে গর্বিত বলেও মন্তব্য করেছেন। তাঁর প্রতিক্রিয়ার পর বিষয়টি রাজনৈতিক মাত্রা পায়। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন, ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে বোঝানো হয়নি। তার বক্তব্য, যারা মাওবাদীদের সমর্থন করে এবং সংবিধানকে অস্বীকার করে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়ায় বা ৩৭০ ধারার পক্ষে অবস্থান নেয়, কিংবা ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডর বিচ্ছিন্ন করার কথা বলে, তাদেরকে এই শ্রেণির মধ্যে নিয়ে ধরা হচ্ছে।
নকশাল আন্দোলনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অভিযান গত এক দশকে নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে একাধিক মাওবাদী নেতা নিহত হয়েছেন, বহু সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন ও গ্রেফতার হয়েছেন। সরকারের দাবি, একসময় মাওবাদী প্রভাবিত বহু অঞ্চলে বর্তমানে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী নকশালবাদের মোকাবিলাকে দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। তাঁর বার্তা, যুবসমাজকে হিংসা ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে দূরে রেখে একটি উন্নত ভারত গড়ার মূল স্রোতে যুক্ত করতে হবে। ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্য পূরণে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
ফলে এবারের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে নকশালবাদ প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থানের পরিধি যে আরো বিস্তৃত হয়েছে, তা স্পষ্ট। এতদিন যেখানে মূলত সশস্ত্র মাওবাদী সংগঠন ও তাদের ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে আলোচনা হত, এবার সেখানে যুক্ত হয়েছে মতাদর্শ, প্রতিষ্ঠান ও জনপরিসরে প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নও। আর সেই নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত শব্দবন্ধ- ‘দিমাগি নকশাল’।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন