প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার ৪৩ নং দড়িগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের বিরুদ্ধে নানান অনিয়ম, দুর্নীতি এবং এলাকাবাসীর সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে নিজের মনমতো স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি (এসএমসি) গঠনের অভিযোগ উঠেছে। উক্ত অভিযোগের প্রতিবাদে এলাকায় এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) সকাল ১১টার দিকে বিদ্যালয় মাঠে অভিভাবক, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাটির সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় ২নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মহর উদ্দিন। সভায় বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সালুয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কামরুল হাসান, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান, এলাকাবাসীর প্রতিনিধিত্বকারী মো. বাবুল মিয়া, মো. জসিম উদ্দিন, লিটন মিয়া, আইন উদ্দিন, আনোয়ার হোসেন, শামসু মিয়া এবং কামরুজ্জামান মেরাজ।
প্রতিবাদ সভা শেষে দুপুরে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ২০ জনের স্বাক্ষরিত দু'টি লিখিত অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর জমা দেয়া হয়। নিজেদের আবেদনে মাহমুদা আক্তারকে অপসারণ করে একজন যোগ্য নতুন প্রধান শিক্ষক বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদায়নের দাবি জানানো হয়।
প্রতিবাদ সভায় বক্তারা ও এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন যে, বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সাথে পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু মাহমুদা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয়ে নানান প্রকার অনিয়ম শুরু হয়েছে। এছাড়া, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দপ্তরী কাম নৈশপ্রহরী মো. এমাদ মিয়া'র দায়িত্ব পালনে অবহেলায় প্রতিদিন রাতে বিদ্যালয় চত্বরে মাদক ও জুয়ার আড্ডা হওয়ার অভিযোগ উঠছে।
তারা আরো অভিযোগ করেছেন যে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তার স্বেচ্ছাচারীভাবে স্লিপের (SLIP) বরাদ্দকৃত টাকা স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির (এসএমসি) অগোচরে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। মা দিবস এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালনের নামে নামমাত্র খরচ দেখিয়ে অথবা দিবস পালন না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে 'ম্যানেজ' করার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে খরচের খাত দেখিয়েছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাবেক শিক্ষার্থীরা প্রত্যয়নপত্র নিতে গেলে তাদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে তাঁর নিজ বাড়িতে প্রাইভেট বা কোচিং পড়তে বাধ্য করেন। কেউ রাজি না হলে পরীক্ষার খাতায় নম্বর কম দেওয়ার হুমকি দেওয়া তাঁর জন্য স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, কোন শিক্ষার্থীর জন্মনিবন্ধন বা অন্য কোন কাজের জন্য স্কুল প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হলে ডুমরাকান্দা বাজারের তাঁর স্বামীর কম্পিউটার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাজ না করালে কোন অভিভাবক সন্তানের নামে প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করেন না। অভিভাবকদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং স্কুল চলাকালীন সময়ে অফিসের কাজে অজুহাত দিয়ে স্কুল ত্যাগ করা, এসব তাঁর নিয়মিত কাজের তালিকায় পরিণত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এলাকাবাসী আরো অভিযোগ করেছেন যে, গত ১৪ মে কমিটি গঠন নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এলাকাবাসীকে নিয়ে একটি মিটিং করেন। এই মিটিংয়ে অভিভাবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে কোনো প্রকার নির্বাচন ছাড়াই সর্বসম্মতিক্রমে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান-কে পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু সেই কমিটি নিজের মনমতো না হওয়ার কারণে, পূর্ববর্তী কোনো নোটিশ ছাড়াই গত ২৫ জুন আবারও একটি মিটিং ডাকেন তিনি। উল্লেখযোগ্যভাবে, উক্ত মিটিংয়ে বেশ কয়েকজন সদস্যের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তানিয়া বেগমের পিতা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন (আঙ্গুর) কে সভাপতি হিসেবে নিয়োগের চেষ্টা করেন। সর্বসম্মতিক্রমে মনোনীত স্থানীয় ইউপি সদস্য কামরুল হাসানের সদস্য পদ বাদ দিয়ে স্কুলের দপ্তরী কাম নৈশপ্রহরী মো. এমাদ উদ্দিনের মা, সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছা. জামেনা-কে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হলে বেশ কয়েকজন অভিভাবক সদস্য আপত্তি জানিয়ে মিটিং বয়কট করেন।
এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের বিরুদ্ধে বিগত ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর দু'টি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও তখন পর্যন্ত সেই বিষয়ে কোনো সুরাহা মেলেনি।
বর্তমানে এলাকার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে অবিলম্বে অপসারণ করে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, "সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১,২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছা. জামেনা-কে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ইউপি চেয়ারম্যান মহোদয় নিজেই মনোনীত করে একটি চিঠি দিয়েছেন। অপর দিকে বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মো. মনিরুজ্জামান-কে মোবাইল মেসেঞ্জারে মিটিংয়ের বিষয়ে অবগত করা হলেও তিনি ২৫ জুনের মিটিংয়ে উপস্থিত হননি এবং অপর এক অভিভাবক সদস্য মুক্তা আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশন হওয়ায় তিনিও উপস্থিত হতে পারেননি। সভাপতির পদে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন (আঙ্গুর) প্রার্থীতা ঘোষণা করায় উপস্থিত সকলের সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে।' এ বিষয়ে সকলের স্বাক্ষর রয়েছে। তিনি আরো জানিয়েছেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে বাড়িতে এনে প্রাইভেট পড়ান। তিনি সত্যিকার সত্য চোখে আনার জন্য সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম নৈশপ্রহরী মো. এমাদ মিয়া বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আনিসুর রহমান এলাকাবাসীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মাসুদুর রহমান বলেছেন, বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন