প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলা সাহিত্যের আকাশে যেসব কবি নিজেদের চিন্তা, স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও আদর্শিক চেতনায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে ফররুখ আহমদ অন্যতম। এই সাহিত্যস্রষ্টা, যিনি ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবে পরিচিত, তাঁর কবিতায় মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়, জাগরণ, মানবিকতা ও ঐতিহ্যচেতনার বিষয়গুলি তুলে ধরেন। কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের সৃজনশীল প্রয়োগ, সমৃদ্ধ উপমা, ছন্দের বৈচিত্র্য এবং গভীর জীবনবোধের মাধ্যমে তিনি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন। কবিতা ছাড়াও তিনি ছড়া, সনেট, কাব্যনাট্য, ব্যঙ্গকবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও সংগীত রচনায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
জন্ম ও শৈশব
ফররুখ আহমদ ১৯১৮ সালের ১০ জুন তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত, বর্তমানে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খানসাহেব সৈয়দ হাতেম আলী এবং মাতা রওশন আখতার। তিনি ছিলেন তাঁদের দ্বিতীয় পুত্র।
শৈশব থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। ছাত্রাবস্থায় তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। অল্প বয়সেই তাঁর কাব্যপ্রতিভা সাহিত্যপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৩৭ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে আইএ পাস করেন। পরে স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বিএ শ্রেণিতে ভর্তি হন, তবে পড়াশোনা শেষ না করেই কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
কর্মজীবন ও সাহিত্যসম্পাদনা
কর্মজীবনের শুরুতে ফররুখ আহমদ কলকাতার আইজি প্রিজন অফিস ও সিভিল সাপ্লাই বিভাগে কাজ করেন। পরে তিনি সাহিত্য ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৫ সালে মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। দেশভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দেন। সেখানে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শিশুদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘খেলাঘর’ পরিচালনা করতেন। বেতারকেন্দ্রে তাঁর কর্মজীবন সাহিত্যচর্চাকে বিস্তৃত করার সুযোগ করে দেয়। কবিতা, গান, বেতার কথিকা ও শিশুতোষ রচনার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন বয়সী পাঠক-শ্রোতার কাছে পৌঁছে যান। যদিও তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি বিস্তৃত ছিল, তবে কবি হিসেবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিতি অর্জন করেন।
আদর্শ, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ
ফররুখ আহমদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক চিন্তায় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। ছাত্রজীবনে তিনি এম এন রায়ের র্যাডিক্যাল মানবতাবাদে আকৃষ্ট হন এবং বামপন্থী চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হন। পরবর্তী সময়ে মুসলিম পুনর্জাগরণ, ইসলামী মূল্যবোধ ও মুসলিম ঐতিহ্য তাঁর সাহিত্যচিন্তার প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হয়।
তবে তাঁর আদর্শিক অবস্থানকে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর জীবন ও সাহিত্যকে পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা সম্ভব নয়। পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি সমর্থন থাকলেও রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলা ভাষার অধিকারের পক্ষে তিনি অবস্থান নেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর সমর্থন ছিল স্পষ্ট। তৎকালীন শাসকদের ভাষানীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনাও তিনি লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করেন। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিও তাঁর সমর্থনের কথা বিভিন্ন জীবনী ও সাহিত্যবিষয়ক আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক জীবনের জটিলতা ও সময়ের সঙ্গে তাঁর চিন্তার বিবর্তন বুঝতে সহায়তা করে।
‘সাত সাগরের মাঝি’: কাব্যজগতে স্বতন্ত্র পরিচয়
১৯৪৪ সালে ফররুখ আহমদের প্রথম ও বহুল আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের কবিতায় মুসলিম সমাজের জাগরণ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, মানবিক বোধ ও স্বপ্নময় অভিযাত্রার চিত্র ফুটে উঠেছে। তাঁর কাব্যভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার, ঐতিহ্যনির্ভর প্রতীক এবং গতিময় ছন্দ এক বিশেষ আবহ তৈরি করে।
চল্লিশের দশকে বাংলায় দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা কবিদের লেখায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ফররুখ আহমদও এ দুর্ভিক্ষের মানবিক বিপর্যয় নিয়ে কবিতা রচনা করেন। তাঁর ‘লাশ’ কবিতাটি ১৯৪৪ সালে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সম্পাদিত দুর্ভিক্ষবিষয়ক সংকলন ‘আকাল’-এ স্থান পায়। দুর্ভিক্ষের নির্মম বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে রচিত এ কবিতায় ক্ষুধা, মৃত্যু ও মানুষের অসহায়তার মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে।
কাব্যনাট্য, সনেট ও ব্যঙ্গকবিতায় দক্ষতা
ফররুখ আহমদের সাহিত্যিক পরিচয় কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ বা একটি ধারায় সীমাবদ্ধ নয়। কাব্যনাট্য, সনেট, ব্যঙ্গকবিতা ও গদ্যরচনায়ও তিনি স্বাতন্ত্র্য দেখিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে— কাব্যগ্রন্থ: ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪), ‘সিরাজাম মুনীরা’ (১৯৫২), ‘মুহূর্তের কবিতা’ (১৯৬৩)। কাব্যনাট্য ও আখ্যানকাব্য: ‘নৌফেল ও হাতেম’ (১৯৬১), ‘হাতেম তা’য়ী’ (১৯৬৬)। শিশুতোষ সাহিত্য: ‘পাখির বাসা’ (১৯৬৫), ‘নতুন লেখা’, ‘হরফের ছড়া’ (১৯৭০), ‘চাঁদের আসর’ ও ‘ছড়ার আসর’ (১৯৭০)। ব্যঙ্গ ও অন্যান্য রচনা: ‘ধোলাই কাব্য’, ‘তসবির নামা’ এবং ‘ঐতিহাসিক অনৈতিহাসিক কাব্য’।
‘নৌফেল ও হাতেম’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যনাট্য। অন্যদিকে ‘হাতেম তায়ী’ কাহিনিকাব্য রচনায় তাঁর দক্ষতার পরিচয় বহন করে। ‘মুহূর্তের কবিতা’সহ তাঁর সনেটসংকলনগুলো বাংলা কবিতায় তাঁর শিল্পসাধনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
ব্যঙ্গকবিতায় তিনি সমাজের অসংগতি, ভণ্ডামি ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। শিশুদের জন্য রচিত ছড়া ও কবিতায়ও তাঁর ভাষার সাবলীলতা ও কল্পনাশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। ফলে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক—বিভিন্ন শ্রেণির পাঠকের জন্য তিনি রেখে গেছেন বৈচিত্র্যময় সাহিত্যভান্ডার।
ফররুখ আহমদ মূলত কবি হলেও সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়ও তাঁর বিচরণ ছিল সমানতালে। তিনি গল্প, প্রবন্ধ, বেতার কথিকা, গীতি-নকশা, হামদ, নাত, দেশাত্মবোধক গান, প্রেমের গান ও ভক্তিমূলক সংগীত রচনা করেছেন। ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক লেখালেখিতেও তাঁর আগ্রহ ছিল।
তাঁর গল্পের মধ্যে ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’, ‘মৃত বসুধা’ ও ‘বিবর্ণ’ উল্লেখযোগ্য বলে পরিচিত। ‘হাবেদা মরুর কাহিনী’ তাঁর গদ্যকবিতার পরিচয় বহন করে। ‘সিকান্দার শা’র ঘোড়া’ নামে একটি উপন্যাস রচনার উদ্যোগও তিনি নিয়েছিলেন, যদিও তা সম্পূর্ণ করতে পারেননি বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। শিশুদের জন্য তাঁর রচিত ছড়া ও কবিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সহজ ভাষা, ছন্দময়তা এবং কল্পনার জগৎ নির্মাণের ক্ষমতা তাঁর শিশুতোষ সাহিত্যকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফররুখ আহমদ জীবদ্দশায় একাধিক পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। ১৯৬১ সালে লাভ করেন প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’। ১৯৬৬ সালে তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার ও ইউনেসকো পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ১৯৮০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়।
জীবনের শেষ পর্বে ফররুখ আহমদ আর্থিক অনটন ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। তাঁর কর্মজীবন, সরকারি চাকরি এবং বাসস্থান নিয়ে নানা জটিলতার কথাও বিভিন্ন জীবনীতে উঠে এসেছে। সাহিত্যিক হিসেবে সম্মান অর্জন করলেও জীবনের শেষ সময়ে তাঁর আর্থিক কষ্টের বিবরণ পাঠককে ব্যথিত করে। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেনের বাসায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন