প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সুন্দরবনের অপরাধ জগতের অবসান ঘটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলো আরও একটি দুর্ধর্ষ জলদস্যু বাহিনীর সদস্যরা।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে সাড়ে ১১টার দিকে ‘ছোট জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ ২৭ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তারা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার মেজবাউল ইসলামের হাতে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে দস্যুতা পরিত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেন।
এর মাধ্যমে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ও সুন্দরবন নিরাপদ করার সরকারি প্রত্যয় আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। এসময় জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি, কোস্টগার্ড, র্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কোস্ট গার্ড জানায়, আত্মসমর্পণকালে জলদস্যুরা তাদের ব্যবহৃত মোট ২৭টি দেশি-বিদেশি অত্যাধুনিক আগ্নেয়স্ত্র কোস্ট গার্ড জোনাল কমান্ডারের হাতে জমা দেন। এর পাশাপাশি ৩৪০ রাউন্ড তাজা গুলি এবং ৫৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেন দস্যু বাহিনীর সদস্যরা। জলদস্যু ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর বিশাল বহরে দীর্ঘদিন ধরে এই বিপুল পরিমাণ মরণাস্ত্র দিয়ে তারা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাউয়ালি, মাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপন আদায় করে আসছিল। যারা মুক্তিপন দিতে অসিকার করতো, তাদের ওপর চালানো হতো মারধর এবং অমানবিক নির্যাতন। পায়ে শিকল বেঁধে আটকে রাখা হতো দিনের পর দিন। চাহিদা মতো মুক্তিপণ পেয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ দস্যুদের বিরুদ্ধে। এছাড়া অনেক জেলেকে আটকে রেখে জোর পূর্ব দস্যুতাও করানো হতো বলেও অভিযোগ এসেছে অনেকের কাছ থেকে।
জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের বিষয় নিয়ে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন সদর দফতরে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। এসময় মঞ্চে ও অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের তিনিধি, কোস্ট গার্ডের শীর্ষ কর্মকর্তা, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ ও বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা আত্মসমর্পণকারী ২৭ দস্যুকে স্বাগত জানান এবং ভুল পথ ছেড়ে আলোর পথে আসার এই সাহসী সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানান।
কোস্টগার্ড কর্মকর্তারা তাদের বক্তব্যে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সুন্দরবনকে জলদস্যু, বনদস্যু ও চোরাকারবারী মুক্ত রাখতে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে বলবৎ থাকবে। বনের ভেতরে আর কোনো নতুন বাহিনীকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না। তবে যারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইবেন, তাদের পুনর্বাসনে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের আইনি ও মানবিক সহযোগিতা করা হবে।
আত্মসমর্পণকারী জলদস্যু বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখ (৪৫), মুজাহিদ গাজী (২৭), বিল্লাল শেখ (৩৫), জাহিদ হাসান (২৮), সুমন ঢালী (৩০), এরশাদ শিকারী (৪২), ওয়াহিদুজ্জামান (৩০), আইউব শেখ (৪২), রাফসান ঢালী (৩০), পারভেজ শেখ (২৭), কামরুল শেখ (২৫), জহুরুল গাজী (৩৮), সিরাজুল তরফদার (৩৮), আমিনুল ইসলাম (৪০), আসাদুল ইসলাম (৪২), বাবুল শেখ (৪৫), শাজাহান শেখ (৪২), হেলাল (৩৮) খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা ও বটিয়াঘাটা থানার বাসিন্দা। আকরাম শেখ (৪৫), নুরুল ইজারদার (৫০), হাসান শেখ (২৭), কামরুল শেখ (২৮), জিয়া শেখ (৩৮), কবির সুলতান (৫৫), কাইয়ুম জমাদ্দার (৪০) ও শরিফুল ইসলাম বয়াতি (২১)। এসব দস্যুদের বাড়ি বাগেরহাট জেলার রামপাল, ফকিরহাট, কচুয়া, মোড়লগঞ্জ, শরণখোলা এবং মোঃ জয়নাল আবেদীন (৩৮) পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া থানার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।
বনজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর এই আত্মসমর্পণের ফলে সুন্দরবনের পশুর নদী ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার জেলেদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসবে এবং নির্ভয়ে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব হবে। জব্দকৃত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও আত্মসমর্পণকারী ডাকাতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাসহ পরবর্তী আইনানুগ কার্যব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মেজবাউল ইসলাম জানান, সুন্দরবনের সকল সক্রিয় বনদস্যুকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। আত্মসমর্পণকারীদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হবে। অন্যদিকে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। সরকারের নির্দেশনা, আপনাদের সকলের সহযোগিতা এবং অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত করতে অভিযান চলমান রয়েছে। চলতি বছরের ২১ মে সুমন বাহিনী ও ৯ জুলাই জাহাঙ্গীর বাহিনীর দুই দফায় ১০ জন জলদস্যু অস্ত্রসহ আত্নসমর্পণ করেছিল।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন