প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পাকিস্তানের গদর বন্দর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত এই বন্দরকে ঘিরে পাকিস্তানের ‘বাণিজ্যিক দুবাই’ হয়ে ওঠার যে স্বপ্ন প্রচার করা হয়েছিল, সেই বাস্তবতা এখন অনেক ভিন্ন।
২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে, তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে ৪৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই মেগা প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) এবং বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি এক দশক অতিক্রম করলেও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বড় আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বন্দরটির সম্ভাবনার যে কথা বলা হয়েছিল, তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গদর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার লোয়ি ইনস্টিটিউটের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বন্দরটি থেকে চীনের প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সুফল এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক চাপের কারণে গদরে বেইজিংয়ের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহও কমে যাচ্ছে।
তবে, এর অর্থ এই নয় যে, চীন গদর থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। বরং নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্বল স্থানীয় অবকাঠামো এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রকল্পটির বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সীমিত করার দিকে এগোচ্ছে বেইজিং।
কৌশলগত দায়বদ্ধতা?
২০১৫ সালে সিপিইসির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পাকিস্তান সফরের সময় গদরকে পশ্চিম চীনের সঙ্গে আরব সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। বন্দরটির অবস্থান পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গদরকে চীনের কাশগরের সঙ্গে সড়ক, রেল ও জ্বালানি অবকাঠামোর মাধ্যমে যুক্ত করার কথা ছিল। চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চায়না ওভারসিজ পোর্ট হোল্ডিং কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদি ইজারায় বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
একই সঙ্গে সিপিইসির আওতায় সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দর ও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
তবে সিপিইসির বড় চ্যালেঞ্জ কী?
প্রকল্পটির প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি। পাকিস্তানের বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো নিয়মিতভাবে চীনা নাগরিক এবং সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আসছে।
২০২৪ সালের মার্চে গদর পোর্ট অথরিটি কমপ্লেক্সে হামলা এবং একই বছরের অক্টোবরে করাচি বিমানবন্দরের কাছে চীনা নাগরিকদের ওপর আত্মঘাতী হামলা নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করে।
পরে চীনা নাগরিক ও প্রকল্পগুলো রক্ষায় পাকিস্তান বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুললেও বিস্তীর্ণ ও অস্থিতিশীল বেলুচিস্তানে অবকাঠামো সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
অনিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি
ভৌগোলিক অবস্থানও গদরের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চীন পর্যন্ত স্থলপথে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল অতিক্রম করতে হয়।
কারাকোরাম মহাসড়কের কিছু অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৬০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। সেখানে ভূমিধস, তুষারধস এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে সমুদ্রপথের তুলনায় দীর্ঘ স্থলপথে জ্বালানি পরিবহনের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বাণিজ্যিক বাস্তুতন্ত্রের অভাব
একটি বন্দরকে সফল বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করতে শুধুমাত্র জেটি ও ক্রেন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পর্যাপ্ত পণ্য পরিবহন, নিয়মিত জাহাজ চলাচল, শিল্প, গুদাম, সড়ক-রেল যোগাযোগ এবং বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। গদর এখনো এমন বাণিজ্যিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারেনি।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পর্যাপ্ত কার্গো না থাকায় বড় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো দুবাই, সালালাহ ও করাচির মতো প্রতিষ্ঠিত বন্দরকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে গদর এখনো মূলত রাষ্ট্রনির্ভর বা বিশেষায়িত কার্গোর ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় বিরোধ ও নতুন চীনা নীতি
বন্দর এলাকার বাইরেও গদর শহরে পানি ও বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় জনগণের একাংশও দীর্ঘদিন ধরে পানি, বিদ্যুৎ, মাছ ধরার অধিকার এবং বন্দরকেন্দ্রিক বিধিনিষেধ নিয়ে আন্দোলন করে আসছে। হক দো তেহরিকসহ বিভিন্ন আন্দোলনে স্থানীয় মানুষের অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে।
ফলে চীনের বিদেশি বিনিয়োগ নীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। বড় আকারের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের পরিবর্তে এখন আর্থিকভাবে টেকসই ও তুলনামূলক ছোট প্রকল্পে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বেইজিং। এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিকভাবে দুর্বল গদরে নতুন করে বড় বিনিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে গদরের গুরুত্ব শুধুমাত্র বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চলে চীনের নৌ-লজিস্টিকসের জন্য বন্দরটির সম্ভাব্য কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। তবে এটিকে চীনের নৌঘাঁটিতে রূপান্তর করা হচ্ছে—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
পাকিস্তানের পিছুটান
লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে চীন গদরের বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কমিয়ে একটি ছোট, কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এবং কৌশলগত ও লজিস্টিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী স্থাপনায় পরিণত করতে পারে।
ফলে গদর চীনের কৌশলগত হিসাব থেকে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে পাকিস্তানের ‘বাণিজ্যিক দুবাই’ বা ‘সিঙ্গাপুর’ হয়ে ওঠার যে স্বপ্নকে কেন্দ্র করে প্রকল্পটির প্রচার করা হয়েছিল, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক ভিন্ন হতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন