প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র ফিজিতে এইচআইভি সংক্রমণের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটায় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মেথামফেটামিন বা ‘মেথ’ মাদকের ব্যবহারের বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে।
বর্তমানে ফিজির জনসংখ্যা ১০ লাখেরও কম, যেখানে প্রতি ৬০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন এইচআইভিতে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এইচআইভি সংক্রমণের হার কমার প্রবণতার বিপরীতে, ফিজিতে সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ফিজি, যা পর্যটন নির্ভর দেশ, সাদা বালুর সৈকত, প্রবালপ্রাচীর ও মনোরম পরিবেশের জন্য পরিচিত, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রথম এইচআইভি সংক্রমণের ব্যাপক বিস্তারের তথ্য প্রকাশ করে।
দেশজুড়ে এইচআইভি পরীক্ষার পরিমাণ বাড়ানোর ফলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতে দেখা যায়, সংক্রমণ কতটা দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্য সংকট কতটা গুরুতর।
মঙ্গলবার, ফিজির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আতোনিও লালাবালাভু জাতীয় জরুরি অবস্থার ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ২০২৫ সালে নতুন করে ২ হাজার ১৬ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, এই সংখ্যা ফিজিতে এইচআইভি সংকটের ভয়াবহতা এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
এদিকে, সেভ দ্য চিলড্রেন ফিজি জানিয়েছে, এইচআইভি সংক্রমণ এখন নবজাতকদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহে মাত্র দুই মাস বয়সী একটি শিশুর শরীরে এইচআইভি ও যক্ষ্মা (টিবি) শনাক্ত হয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে কম বয়সী রোগী। এইচআইভি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৫৯টি শিশু তাদের মায়ের কাছ থেকে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে। পাঁচ বছর আগে ধারণা করা হতো, ফিজিতে প্রতি ১৬৭ জনের মধ্যে একজন এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে শিরায় মাদক গ্রহণের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মাদক পাচারের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। আমেরিকা অঞ্চল থেকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও এশিয়ার বিভিন্ন লাভজনক বাজারে মাদক পাচারের ক্ষেত্রে ফিজি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফিজিতে কনডমের কম ব্যবহার, সামাজিক কলঙ্ক এবং যৌনবাহিত সংক্রমণ এইচআইভি প্রাদুর্ভাব মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জাতিসংঘের এইচআইভি/এইডসবিষয়ক যৌথ কর্মসূচি ইউএনএইডসের ফিজি উপদেষ্টা রেনাটা রাম বলেছেন, উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানও সংকটের পুরো চিত্র তুলে ধরছে না।
সিএনএনকে রাম বলেন, এইচআইভি দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এবং অনেক মানুষ যে নিজেদের অজান্তেই ভাইরাসটি নিয়ে বসবাস করছেন, এ দুটি বিষয় তাকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করছে। রামের তথ্য অনুযায়ী, ফিজিতে এইচআইভিতে আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ৩৯ শতাংশ জানেন যে তারা সংক্রমিত। আক্রান্তদের মাত্র ২২ শতাংশেরও কম চিকিৎসার আওতায় রয়েছেন।
চিকিৎসা না করা হলে এইচআইভি ধীরে ধীরে এইডসে রূপ নিতে পারে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয় এবং বিভিন্ন গুরুতর রোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ফিজির জাতীয় স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে এইচআইভিজনিত মৃত্যু হয়েছিল ২৫ জনের। চার বছর পর, ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ১১৭ জনে দাঁড়িয়েছে।
ফিজিতে এইচআইভি সংক্রমণের বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। তবে ইউএনএইডসের ফিজি উপদেষ্টা রেনাটা রাম বলেন, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ এখন এইচআইভি ছড়ানোর অন্যতম প্রধান ও দ্রুত বাড়তে থাকা কারণ। একই সুঁই বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
অপরাধী চক্রের মাধ্যমে ফিজিতে বিপুল পরিমাণ মেথামফেটামিন পাচার হচ্ছে। এই মাদক স্থানীয় মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ায় দেশটিতে মাদকাসক্তির সমস্যা তৈরি হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
ফিজির জাতীয় স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন এইচআইভি সংক্রমণের যেসব ঘটনায় সংক্রমণের কারণ জানা গেছে, তার প্রায় অর্ধেকই ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাকি প্রায় অর্ধেক সংক্রমণ ঘটেছে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে।
রাম বলেন, কনডমের কম ব্যবহার, একাধিক যৌনসঙ্গী, সীমিত এইচআইভি পরীক্ষা এবং সামাজিক কুসংস্কার ও লোকলজ্জার ভয়, এসব কারণও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, বীর্যসহ নির্দিষ্ট শরীরের তরল অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করলে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আতোনিও লালাবালাভু জানান, ফিজিতে প্রতি ৫০ জন গর্ভবতী নারীর মধ্যে একজন এইচআইভিতে আক্রান্ত। আক্রান্ত মা থেকে গর্ভাবস্থায়, প্রসবের সময় এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে শিশুর মধ্যে এইচআইভি সংক্রমিত হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এইচআইভি মোকাবিলায় অগ্রগতি হলেও ফিজির পরিস্থিতি সেই বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীত।
রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে নতুন এইচআইভি সংক্রমণ প্রায় ৪২ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, একই সময়ে ফিজিতে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চিকিৎসার আওতায় আসার ক্ষেত্রেও ফিজি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
রাম জানান, বিশ্বজুড়ে এইচআইভিতে আক্রান্ত মানুষের প্রায় ৭৮ শতাংশ চিকিৎসার আওতায় থাকলেও ফিজিতে এই হার অনেক কম। চিকিৎসার আওতায় থাকা মানুষের হারেও ফিজি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে এইচআইভিতে আক্রান্ত প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন, যেখানে ফিজিতে চিকিৎসা গ্রহণকারীর হার এর চেয়ে অনেক কম।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন