প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতি পাওয়ার পর সুন্দরবনের মধু নিয়ে দেশ-বিদেশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা রফতানি বাজার সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখছিলেন, তবে সেই সম্ভাবনার মাঝে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রবণতা।
জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনুকূল আবহাওয়ার অভাব, বনাঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ফুলের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে সুন্দরবনের মধু আহরণ গত পাঁচ বছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে মৌয়ালের সংখ্যা, বন বিভাগের রাজস্ব এবং মধু আহরণের জন্য দেয়া পাসও কমেছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ হয়েছে এক হাজার ৭৪০ দশমিক ৫০ কুইন্টাল বা প্রায় ১৭৪ মেট্রিক টন মধু। আগের মৌসুমে এ পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৭৫ কুইন্টাল বা প্রায় ২০৭ মেট্রিক টন। এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ৩৩৪ দশমিক ৫০ কুইন্টাল, যা প্রায় ১৬ দশমিক ১ শতাংশ। একই সময়ে বন বিভাগের রাজস্ব ৩৩ লাখ ২১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে কমে ২৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮০০ টাকায় নেমে এসেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, পাঁচ বছর আগে সুন্দরবন থেকে প্রায় ৩০০ মেট্রিক টনের বেশি মধু আহরণ হতো। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ৩০০ মেট্রিক টন। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ২৮২ মেট্রিক টনে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে ৩১৮ মেট্রিক টনে পৌঁছালেও এরপর আবার শুরু হয় নিম্নমুখী ধারা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে আসে ২০৭ মেট্রিক টনে। আর সর্বশেষ মৌসুমে সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১৭৪ মেট্রিক টন, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
মধু উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাতেও।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মধু আহরণের জন্য অনুমতি নিয়েছেন ৫৫২টি দল ও ৩ হাজার ৪৮১ জন মৌয়াল। আগের মৌসুমে এ সংখ্যা ছিল ৬৫৫টি দল এবং ৪ হাজার ১৫৮ জন মৌয়াল। অর্থাৎ এক বছরে ১০৩টি দল ও ৬৭৭ জন মৌয়াল কম বনে গেছে।
মৌয়ালরা বলছেন, বনাঞ্চলে প্রবেশে জলদস্যুদের দাপট, খরচ বৃদ্ধি এবং অনুকূল বৃষ্টিপাতের অভাবের কারণে ফুলের পরিমাণ কমে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে মধু উৎপাদনেও।
খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জের মৌয়াল মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আগে একেকটা চাক থেকে অনেক বেশি মধু পাওয়া যেত। এবার অনেক জায়গায় ঘুরেও তেমন চাক পাইনি। গেওয়া, খলসি ও অন্যান্য গাছে ফুল কম হওয়ায় মৌমাছিও কম এসেছে। নৌকা ভাড়া, জ্বালানি এবং শ্রমিকের খরচ সবই বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেই খরচই উঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
একই উপজেলার আরেক মৌয়াল মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বনে ঢুকতে এখনও নানা ধরনের ঝুঁকি থাকে। অনেক সময় নিরাপত্তার চিন্তা নিয়েই কাজ করতে হয়। তার ওপর আগের মতো মধু পাওয়া যায় না। কয়েকদিন বনে থেকে যে পরিমাণ মধু পাওয়া যায়, তা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
মৌয়াল শেখ নুর ইসলাম বলেন, ‘আমরা বছরের এই মৌসুমটার জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে মধুর পরিমাণ কমতেই আছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ফুল কম ফোটে, ফলে চাকও ছোট হয়। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক মৌয়াল এবার বনে যাওয়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছেন।’
উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে ব্যবসায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জিআই স্বীকৃতির কারণে সুন্দরবনের মধুর চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে জানান সুন্দরবন পিওর মার্টের স্বত্বাধিকারী আবু হানিফা সজীব।
তিনি বলেন, ‘জিআই স্বীকৃতির পর দেশ-বিদেশে সুন্দরবনের মধুর চাহিদা অনেক বেড়েছে। অনলাইন ও করপোরেট পর্যায় থেকেও নিয়মিত অর্ডার আসছে। কিন্তু উৎপাদন কম থাকায় সেই চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন বাড়ানো গেলে রফতানির সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং বননির্ভর মানুষের আয়ও বাড়বে।’
সংশ্লিষ্টরা বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, ফুল ফোটার সময়, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তনের সঙ্গে মধু উৎপাদনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
সুন্দরবন বন বিভাগের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘মধু উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফুলের উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে মধু আহরণে। বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ এবং মৌয়ালদের নিরাপদে মধু আহরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, মৌমাছির খাদ্য উদ্ভিদ সংরক্ষণ, বনাঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী বছরগুলোতে সুন্দরবনের মধু উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে হাজারো বননির্ভর পরিবার, পাশাপাশি থেমে যাবে জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এ পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন