প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইভটিজিং ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং শাহজাদপুর থানার যৌথ উদ্যোগে র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকাল ১০টায় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ভবন-৩ প্রাঙ্গণ থেকে একটি সচেতনতামূলক র্যালি বের হয়। র্যালিটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বিসিক বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হয়। পরে বিসিক বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন স্থানে ইভটিজিং ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার। এ সময় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আসাদুজ্জামান এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শাহজাদপুর সার্কেল) হাফিজুর রহমান, শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবরিনা শারমিন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল, শাহজাদপুর পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাজী আইয়ুব আলী, শাহজাদপুর উপজেলা জামাতের আমির মিজানুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) নজরুল ইসলাম, বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শাহজাদপুর থানার কর্মকর্তাবৃন্দসহ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ারা সাংবাদিকবৃন্দ র্যালি ও আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার বলেন, ইভটিজিং ও যৌন হয়রানি শুধু আইনগত সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও দৃষ্টিভঙ্গিগত ব্যাধি। আইন প্রণয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগের পরও এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় সমাজের প্রতিটি মানুষের সম্মিলিতভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, নারীর প্রতি সম্মান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবার থেকেই গড়ে তুলতে হবে। একজন বাবা, ভাই, সন্তান কিংবা পরিবারের কোনো সদস্য যখন কোনো নারীকে হয়রানি করে বা তার প্রতি সহিংস আচরণ করে, তখন সেটি আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তাই অন্যের মা, বোন ও মেয়েকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো সম্মান করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। উপাচার্য মহোদয় আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো মনীষীরা নারীকে দুর্বল হিসেবে নয়, বরং শক্তি ও সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হওয়ায় নারীদের বাদ দিয়ে কোনো সমাজের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি শিক্ষার্থী, পথচারী, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতকারী নারী শিক্ষার্থী কিংবা স্কুলগামী শিশুদের পথ নিরাপদ করা সবার দায়িত্ব। একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। শিশু ও নারীর প্রতি যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধে পরিবার থেকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করে অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার বলেন, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রত্যেক সদস্যকে সম্মিলিতভাবে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার প্রতিও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি মাদকাসক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত আসক্তি তরুণ সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সংস্কৃতি চর্চা ও যুব কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে হবে। সবশেষে উপাচার্য মহোদয় বলেন, নারীকে সম্মান করা এবং নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু নারীর বিষয় নয়; এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। সমাজের প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করলে ইভটিজিং, যৌন হয়রানি ও নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। সংস্কৃতি দিয়ে মাদক রুখবো, নারীর হাত দিয়েই দেশ গড়বো বলে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ইভটিজিং ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। শৈশব থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা ও নারীকে সম্মান করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শাহজাদপুরে এসে পড়াশোনা করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের তাদের নিজেদের সন্তান ও বোনের মতো সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিশেষ করে পরিবহন খাতে নারীদের হয়রানি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। বর্তমান সরকার অতীতের যেকোনো সরকারের চেয়ে অধিক জনবান্ধব উল্লেখ করে ট্রেজারার মহোদয় বলেন, ধর্ষন, যৌন হয়রানি, নারী নির্যাতনসহ যেকোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে সাথে সাথে অপরাধীদের ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইভটিজিং ও যৌন হয়রানির মতো অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের হয়রানি বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে ৯৯৯ ও নারী-শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯-এ যোগাযোগ করতে হবে। সর্বোপরি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সচেতন হয়ে অন্যকে সচেতন করার এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সিরাজগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা, ইভটিজিং ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সমাজের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, পরিবার, পরিচিতজন, সহপাঠী কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-বিভিন্ন ক্ষেত্রেই নারীরা হয়রানি ও সহিংসতার ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের মাধ্যমে নারীদের হয়রানির নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা সীমিত হওয়ায় শুধু পুলিশের পক্ষে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রত্যেক নাগরিকের বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযম জাগ্রত করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা ও ইভটিজিং প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ব্যক্তিগত বিবেক ও নৈতিক মূল্যবোধেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পুলিশ সুপার মহোদয় আরও বলেন, ইভটিজিং, যৌন হয়রানি ও নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। সিরাজগঞ্জ জেলায় এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রয়োগ করা হবে। পুলিশ, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ জনগণকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আমরা এক ও অভিন্ন অবস্থানে থাকব, একত্রে এগিয়ে যাব।
র্যালি ও আলোচনা সভার মাধ্যমে ইভটিজিং, যৌন হয়রানি এবং নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন