প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় পুলিশ যখন হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করে, তখন নেহা বোরা প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তিনি বারবার ব্যারিকেড টপকে দৌড়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে এড়িয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন।
শেষ পর্যন্ত ২৯ বছর বয়সী নেহাকে পুলিশ টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলার পরও তিনি জানালা দিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। আটকের পর মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবার রাস্তায় নেমে আসেন, আর পুলিশ তাকে আবারো ধাওয়া করতে শুরু করে।
এই ছাত্রনেতার আপসহীন মনোভাব ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিক্ষোভ দমনে মোতায়েন করা শক্তি প্রদর্শনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
ভারতের ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ নামক যুব আন্দোলনের নেতারা যখন আটক হন এবং বড় ধরনের বিক্ষোভের পরিকল্পনা যখন বাধাগ্রস্ত হয়, তখনও নেহা ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো রাজপথে চাপ অব্যাহত রেখেছে।
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো নেহাকে জাতীয় পর্যায়ের বিরোধী রাজনীতির পরিচিত মুখে পরিণত করেছে।
কখনো সোমবারে বিরোধী দলের এক সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ নেহাকে ঘিরে ফেলেছে। কখনো মঙ্গলবার তিনি কয়েক ডজন নেতার সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই পুরুষ এবং বয়সে নেহার দ্বিগুণ। তার এই উত্থান ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং বিশেষ করে রাজধানীতে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভেরই প্রতিফলন। বিশেষ করে রাজধানীতে এসব উদ্বেগ তীব্র। রাজনৈতিক নেতাদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।
নরেন্দ্র মোদি নিজেকে একজন ‘শক্তিশালী নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন; একই সঙ্গে তিনি ভিন্নমত দমন করেছেন এবং আন্দোলনকারীদের কারাগারে পাঠিয়েছেন, যাদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে বিচার ছাড়াই কারাবন্দি রয়েছেন। মোদি যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন নেহার বয়স ছিল ১৭ বছর। ক্যাম্পাসের বামপন্থী রাজনীতিতে এক দশকের সক্রিয়তার সুবাদে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন।
টানা ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সম্পর্কে নেহা বলেন, “তারা গণতন্ত্রের সীমা নতুন করে নির্ধারণ করেছে, জবাবদিহিতার সীমা নতুন করে নির্ধারণ করেছে, এমনকি ভিন্নমত প্রকাশের সীমাও নতুন করে নির্ধারণ করেছে। যেহেতু তারা সবকিছুর সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছিল, তাই আসলে কী ঘটছিল, বা আমাদের জন্য তারা ঠিক কী ধরনের কৌশল বা ‘প্লেবুক’ তৈরি করছিল, তা বুঝতে আমাদের কিছুটা সময় লেগেছে।”
গত সপ্তাহান্তে তরুণদের বিভিন্ন সংগঠন ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় কারচুপি করে অন্যায্য নির্বাচনী সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ তোলে এবং তাদের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়। পুলিশ এই বিক্ষোভকে অবৈধ ঘোষণা করে, নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকা অবরুদ্ধ করে এবং আয়োজকদের আটক করে। কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের জমায়েত ঠেকিয়ে দিলেও, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট ছোট বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র সংগঠনগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিক্ষোভের বার্তা ছড়িয়ে দেয় এবং আন্দোলনটি যে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, সেই আবহ বজায় রাখে।
মোদি-সমর্থিত ডানপন্থী দল বিজেপির আদর্শে বিশ্বাসী এক সামরিক পরিবারে বেড়ে ওঠা নেহা, ২০১৬ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন, যা তার পরিবারের ভেতরে মতপার্থক্যের সৃষ্টি করে।
তিনি ‘সাংওয়ারি’ নামের একটি পথনাট্য দলের সঙ্গে যুক্ত হন। এই দলটি বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় নাটক পরিবেশন করত। পাশাপাশি অধ্যাপক ও কবিদের নিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক আলোচনা আয়োজন করত। এই দল থেকেই নেহা গান গাওয়া, অভিনয় এবং রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে যুক্ত হতে শেখেন। পাঁচ বছর আগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কৃষকদের এক বিক্ষোভে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় নেহা চা পান করছেন। সেখানে তাকে সাংবাদিকের অবজ্ঞাসূচক সুর এবং বারবার কথার মাঝে বাধা দেওয়ার ঘটনায় বেশ বিরক্ত হতে দেখা যায়।
ক্যাম্পাসভিত্তিক সক্রিয়তা এবং দীর্ঘদিনের পথনাটকের অভিজ্ঞতা নেহাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের মাধ্যমে শক্তিশালী শাসক এবং তার অনুসারীদের দ্বারা তাকে ‘দেবতুল্য’ করে তোলার প্রবণতাকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে আরও দক্ষ করে তুলেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে ক্ষোভের মুখে, নেহা অন্যান্য ছাত্রনেতাদের সঙ্গে মিলে একটি অনশন কর্মসূচিতে যোগ দেন। এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক। পুলিশ শুরুতে জোরপূর্বক এই অবস্থান কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হওয়ার পর মোদি নতি স্বীকার করেন এবং তার শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন। এই ঘটনাটি পুরো দেশের নজর কাড়ে এবং নেহাকেও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
বর্তমানে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিষয়ে ডক্টরেট গবেষণারত নেহা নয়াদিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলে প্রতিবাদ প্রদর্শনের জন্য সরকারি অনুমতির বাধ্যবাধকতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ক্ষমতার একটি বিশাল প্রদর্শনী তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। তবে এটাও সত্য এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, এই ক্ষমতাকে কেবল একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্তই সুসংহত রাখা সম্ভব।”
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন