প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ২০ ডলার হলে সরকারকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। চলতি বছরে সরবরাহ বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশকে এর চেয়েও বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের ভর্তুকির বোঝা বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চ ব্যয় এবং অর্থায়ন সংকটের কারণে বাংলাদেশসহ এশিয়ার চারটি দেশে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানি টার্মিনাল নির্মাণের অর্ধেকের বেশি প্রকল্প বাতিল হয়েছে অথবা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ফলে নতুন এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) একটি নতুন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘এলএনজি-টু-পাওয়ার ইন ইমার্জিং এশিয়া: আ ফাইভ-ইয়ার রিভিউ অব প্রজেক্ট আউটকামস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের গত পাঁচ বছরের এলএনজিভিত্তিক প্রকল্প পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২০২১ সালের পর থেকে উচ্চ ব্যয়, অর্থায়ন সংকট এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে চার দেশে প্রস্তাবিত অধিকাংশ প্রকল্পই প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার দেশে সম্ভাব্য ১০ হাজার ৯২০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ৯২টি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ২ হাজার ১০০ কোটি ডলার ব্যয়ের ৪৪টি এলএনজি আমদানি টার্মিনাল পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৪৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ২২টি আমদানি টার্মিনাল প্রকল্প বাতিল হয়েছে অথবা সেগুলোর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত সম্ভাব্য ব্যয় ৬ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার।
অন্যদিকে, এ সময়ে চার দেশে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ১১ শতাংশ এবং এলএনজি আমদানি টার্মিনালের সক্ষমতার ১৫ শতাংশ চালু হয়েছে। বাস্তবায়িত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে গড়ে সাত বছরের বেশি সময় নিয়েছে। অথচ প্রকল্প উন্নয়নকারীরা সাধারণত তিন থেকে চার বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন।
আইইইএফএর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানিবিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, "গত চার-পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামের ওঠানামা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও মূল্যসংবেদনশীল দেশের জন্য জ্বালানি ব্যয় বহন এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।" তিনি আরও বলেন, দেশের নিজস্ব গ্যাসসম্পদের ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ করা গেলে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে।
এলএনজির ব্যয় বাড়ায় বাড়ছে আর্থিক ঝুঁকি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামের অস্থিরতা, মূলধনি ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস টারবাইন সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা এবং ডলারের বিপরীতে এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়ন এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাবনাকে দুর্বল করেছে। এসব কারণে প্রকল্পের জন্য ব্যাংকঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনের সহলেখক ও আইইইএফএর এশিয়ার এলএনজি ও গ্যাস বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার ডোলম্যান বলেন, "এসব ঝুঁকির কারণে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুরো জীবনকালের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ২০২১ সালের প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় সর্বোচ্চ ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।" উদীয়মান এশিয়ার অনেক দেশের জ্বালানি পরিকল্পনা তুলনামূলক কম জ্বালানির দাম ও সাশ্রয়ী মূলধনি ব্যয়ের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়ার স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২৭ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছায়, যা সংঘাত শুরুর আগের দামের প্রায় তিন গুণ। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন এবং ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম ২০২০ সালের আগের গড় দামের তুলনায় অনেক বেশি রয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্ববাজারে গ্যাস টারবাইনের সংকট নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ব্যয় বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূলধনি ব্যয় ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেড়েছে। ভারী শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাস টারবাইন সরবরাহ পেতে এখন ছয় বছর বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তি ব্যয় কমছে। এসব প্রকল্প তুলনামূলক দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ায় পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে বিদ্যমান গ্যাস অবকাঠামোর বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বাংলাদেশে গ্যাসের উচ্চমূল্য, বাড়ছে ভর্তুকির বোঝা। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরে শফিকুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২০ ডলার হলে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে সরকারকে ৬০ টাকারও বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। কিন্তু চলতি বছর সরবরাহ বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন সময়ে এর চেয়েও বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। এতে আগে থেকেই চাপে থাকা সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
আইইইএফএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর বাংলাদেশে তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। তবে এলএনজি ও বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয়ের কারণে সরকারের ভর্তুকির বোঝা বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে বহিঃস্থ অর্থায়নের ওপর নির্ভরতাও গভীর হয়েছে। এত ব্যয়ের পরও অনির্ভরযোগ্য এলএনজি সরবরাহের কারণে দেশে গ্যাসসংকট অব্যাহত রয়েছে।
শফিকুল আলমের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সংকট সমাধানে শুধু এলএনজি আমদানি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং নিজস্ব গ্যাসসম্পদের ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানির চাহিদার দিকেও বিদ্যুতায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে শিল্পকারখানায় গ্যাসচালিত বয়লারের পরিবর্তে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন হিট পাম্প ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
চার দেশে চার ধরনের সংকট
প্রতিবেদনে চার দেশের এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সমস্যা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।
ফিলিপাইনে ২০২১ সালের পর বেশ কয়েকটি এলএনজি প্রকল্প বাতিল হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যাংকঋণ পাওয়ার উপযোগী বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করতে না পারাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ খাতের বাইরে এলএনজির পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকায় নতুন আমদানি টার্মিনাল নির্মাণের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও দুর্বল হয়েছে।
ভিয়েতনামে এলএনজি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গত পাঁচ বছরে মাত্র একটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাণিজ্যিক উৎপাদনে এসেছে। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অর্থায়নযোগ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এলএনজির দাম বৃদ্ধি এবং সেই ব্যয় বিদ্যুতের দামের মাধ্যমে আদায় করতে না পারার ঝুঁকি রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থার আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে।
থাইল্যান্ডে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে তুলনামূলক বেশি অগ্রগতি হলেও বিদ্যমান গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে।
প্রতিবেদনের সহলেখক ও আইইইএফএর এশিয়ার এলএনজি ও গ্যাসবিষয়ক গবেষণা প্রধান স্যাম রেনল্ডস বলেন, "সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা উদীয়মান এশিয়ার দেশগুলোতে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।" একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য আয়ের সম্ভাবনাও দুর্বল হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে এলএনজির সম্প্রসারণ বৈশ্বিক গ্যাসশিল্পের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীরগতিতে এগিয়েছে।
তিনি বলেন, "২০২১ সালের পর এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বল চিত্র থেকে স্পষ্ট যে, উদীয়মান এশিয়ায় দ্রুত এলএনজির চাহিদা বাড়বে বলে যে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বাস্তবে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির সঙ্গে তার বড় ব্যবধান রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন