প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে কেউ প্রকৌশলী হন, কেউ ব্যাংকার। ভালো বেতন, প্রতিষ্ঠিত কর্মজীবন আর শহুরে স্বাচ্ছন্দ্যের হাতছানি থাকে অনেকের সামনে। তবে নাইলা সারাফ লিজার কাছে সাফল্যের অর্থটা একটু আলাদা। প্রকৌশলী ও ব্যাংকার হিসেবে কাজ করার পর তিনি বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা। এখন তাঁর সময় কাটে নেত্রকোনার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের সঙ্গে।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাইলা সারাফ লিজা শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি তাদের ‘লিজা আপা’—কখনোবা সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা লিজার শিক্ষাজীবন কেটেছে দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে তিনি ভর্তি হন বুয়েটে। পড়াশোনা শেষ করে ২০০৯ সালের দিকে যোগ দেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি), সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে। পরে ২০১১-১২ সালের দিকে চাকরি নেন জনতা ব্যাংকে।
কিন্তু প্রকৌশলী কিংবা ব্যাংকার—কোনো পেশাতেই নিজেকে দীর্ঘদিন আটকে রাখতে পারেননি তিনি। নিজের অনুভূতি জানিয়ে লিজা বলেন, ‘জব তো কখনো খারাপ হয় না। তবে আমার নিজেকে কখনো মনে হয়নি যে ওই জবগুলোতে আমি খুব বেশি ফিট।’
শিশুদের সঙ্গে অন্য রকম এক বন্ধন
২০১৭ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বুয়েট থেকে পাস করা একজনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়কর। শুরুতে লিজার মনেও সংশয় ছিল। প্রথম তিন মাস তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এই পরিবেশে তিনি থাকতে পারবেন তো?
কিন্তু সহকর্মীদের আন্তরিকতা আর শিশুদের সরল মুখ তাঁকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অন্য চাকরির সুযোগ এলেও তিনি থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শিশুদের কাছেই।
লিজার কাছে শিক্ষকতা মানে শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শেখানো নয়। শিশুদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মনে করেন, একজন শিক্ষককে শিশুদের মন বুঝতে হবে। কেবল শাসন করে কিংবা বারবার একই কথা বলে কাউকে শেখানো যায় না। বরং শিক্ষার্থীর নিজের ভেতর থেকে শেখার আগ্রহ তৈরি করতে পারাটাই আসল।
লিজার ভাষায়, ‘শিক্ষক হওয়ার জন্য শিশুদের ভেতরে প্রবেশ করতে পারা এবং তাদের মোটিভেট করার ক্ষমতা থাকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমি নিজেকে খুব সাধারণ একজন মানুষ মনে করি। আমি শুধু ওদের মোটিভেট করার চেষ্টা করি, উৎসাহ দিই। শিক্ষার্থী নিজে থেকে না শিখলে আমি সারাদিন ঘ্যানঘ্যান করলেও কোনো লাভ হবে না।’
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক, কখনো বন্ধু
লিজার শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও কিছুটা আলাদা। শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেকে ভয়ের কারণ করে তুলতে চান না তিনি। বরং এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান, যেখানে শিশুরা ভুল করলেও নির্ভয়ে তা স্বীকার করতে পারে।
টিফিনের সময় শিশুদের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়ার মধ্য দিয়েও তৈরি হয় তাঁর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আন্তরিক সম্পর্ক।
লিজা বলেন, ‘আমি যখন পড়াই, তখনো যদি কেবল নিজেকে শিক্ষক মনে করি, তাহলে ওরা আমাকে ভয় পাবে। আমি ক্লাসে ওদের বন্ধু। ওরা কোনো ভুল করলেও নির্দ্বিধায় আমার কাছে স্বীকার করতে পারে।’
তাঁর বিশ্বাস, শিশুরা নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশে থাকলে শেখার প্রতি আগ্রহী হয়। তাই পাঠদানের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তিনি।
পড়াশোনার বাইরেও শেখার জগৎ
সাহিত্যচর্চা, ছবি আঁকা, নাচ, গান ও আবৃত্তির প্রতি লিজার রয়েছে গভীর আগ্রহ। এসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে তিনি শিশুদের মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করেন।
তাঁর মতে, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। শিশুদের সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি ও সাংস্কৃতিক বোধ বিকাশেও ভূমিকা রাখতে হয়।
নিজের আগ্রহ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের সেই জগতের সঙ্গে পরিচিত করানোর চেষ্টা করেন তিনি। আর এভাবেই শিক্ষকতার সঙ্গে তৈরি হয়েছে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক।
ঢাকার জীবন ছেড়ে শেকড়ের কাছে
লিজার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। বাবা ছিলেন কাস্টমস কর্মকর্তা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। পড়াশোনা ও কর্মজীবনের শুরুর সময়ও ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক।
তবে তাঁর পারিবারিক শেকড় নেত্রকোনায়। বাবার বাড়ি ও দাদার বাড়ির সূত্রে এই জেলার সঙ্গে রয়েছে তাঁর গভীর সম্পর্ক। একসময় সেই শেকড়ের কাছেই থিতু হয়েছেন তিনি।
শুরুতে মফস্বলের পরিবেশ ও যাতায়াতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগলেও এখন নেত্রকোনার জীবন তাঁকে স্বস্তি দেয়। ঢাকার ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনের তুলনায় এখানকার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি তাঁকে আকৃষ্ট করেছে।
বর্তমানে স্বামী ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে নিয়ে নেত্রকোনায় থাকেন লিজা। তাঁর ছেলে পড়াশোনা করছে মায়ের কর্মস্থল পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই।
সাফল্যের সংজ্ঞা যেখানে আলাদা
একজন বুয়েট স্নাতক হিসেবে প্রকৌশল কিংবা ব্যাংকিং পেশায় আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল নাইলা সারাফ লিজার সামনে। কিন্তু তিনি নিজের ভালো লাগা খুঁজে পেয়েছেন শিশুদের শেখানোর মধ্যে, তাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গী হওয়ার মধ্যে।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করে তিনি বুঝেছেন, বড় ডিগ্রি থাকলেই একজন ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না। শিশুদের বোঝার ক্ষমতা, তাদের উৎসাহিত করা এবং শেখার আনন্দ তৈরি করাই শিক্ষকতার বড় শক্তি।
বাংলাদেশে যত দিন থাকবেন, শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রত্যয়ও জানিয়েছেন তিনি।
লিজার গল্প তাই শুধু পেশা বদলের গল্প নয়; এটি নিজের ভালো লাগাকে গুরুত্ব দেওয়ার গল্প। যে মানুষটি একসময় প্রকৌশলবিদ্যা শিখেছিলেন, তিনি এখন শিশুদের স্বপ্ন দেখতে শেখান। তাঁর কাছে সাফল্য বড় কোনো পদ বা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; বরং ছোট ছোট শিক্ষার্থীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সুযোগ।
আর সেই কাজটিই নীরবে করে চলেছেন নেত্রকোনার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘লিজা আপা’।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন